পাইপলাইন ত্রুটি: বাড়ছে এলএনজির অপচয় ও পরিচালন ব্যয়

স্টাফ রিপোর্টার:
জাহাজে করে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করা হলেও তা সরবরাহ করা যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন জাহাজে থেকেই হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে গ্যাস, অন্যদিকে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। মূলত সঠিকভাবে এলএনজি সরবরাহের পাইপলাইন তৈরি না হওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দেড় মাস ধরে নোঙর করে আছে কমিশনিং কার্গো। কিন্তু এখনো প্রথম কিস্তির এলএনজি সরবরাহ সম্ভব হয়নি। ফলে পেট্রোবাংলাকে আর্থিক ক্ষতি গুনতে হচ্ছে। পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সূত্রমতে, এলএনজি অন্যান্য তরল পদার্থের মতোই উদ্বায়ী। ক্রায়োজেনিক লিকুইড ট্যাংকে এ গ্যাস মজুদ করা হয়। তবে ক্রায়োজেনিক ট্যাংকে তাপের কারণে এলএনজির একটি অংশ উড়ে যায়। মজুদকালীন ও লোড-আনলোডের সময় তাপজনিত কারণে এই অপচয় হয়ে থাকে। তাতে গ্যাসের পরিমাণ হ্রাস পায়। মহেশখালীতে আমদানিকৃত এলএনজির ক্ষেত্রেও এমনটা হচ্ছে। কমিশনিং কার্গো বসিয়ে রাখার কারণে বয়েল-অফ গ্যাস ও পরিচালন ব্যয় বাবদ সংস্থাটির প্রায় অর্ধকোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। তাছাড়া কমিশনিং কার্গোর পর ধারাবাহিকভাবে পরবর্তী যেসব জাহাজ আসার কথা, সেগুলো না আসার কারণেও গ্যাস ব্যবহার ছাড়াই ব্যয় বহন করতে হবে। তাতে করে পেট্রোবাংলার আর্থিক ক্ষতি আরও বাড়বে।
সূত্র জানায়, বিগত ২৪ এপ্রিল এলএনজির প্রথম কিস্তি নিয়ে কমিশনিং কার্গো কক্সবাজারের মহেশখালীতে পৌঁছায়। গত ১২ মে পাইপলাইনের মাধ্যমে ওই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের কথা ছিল। কিন্তু এফএসআরইউ থেকে জিরো পয়েন্ট তথা জাতীয় গ্রিডের আগ পর্যন্ত সাড়ে ৭ কিলোমিটার পাইপলাইনের বিভিন্ন অংশে ছিদও দেখা দেয়ায় তা সম্ভব হয়নি। এরপর পুনরায় সরবরাহের তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২৬ মে। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যেও পাইপলাইনের ত্রুটি মেরামত না হওয়ায় দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০০ ঘনমিটার (৬০ হাজার ৪৭ টন) এলএনজিবাহী জাহাজটি সাগরে নোঙররত অবস্থায় বসে আছে। বিশাল ওই জাহাজের পরিচালন ব্যয় (ফিক্সড অপারেটিং কস্ট) ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ দৈনিক ডেমারেজ বা লোকসান গুনতে হচ্ছে ৫০ হাজার ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪০ লাখ টাকা। এক্সিলারেট এনার্জি টার্মিনাল নির্মাণ ব্যয় বহন করলেও অপচয়ের ব্যয় বহন করতে বাধ্য নয়। কারণ নির্মাণ ও ব্যবহার চুক্তি অনুযায়ী ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) ও টার্মিনাল থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের ব্যয় মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির। কিন্তু গ্যাসের অপচয় ও নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করতে না পারার কারণে যে ক্ষতি, তা আমদানিকারক হিসেবে পেট্রোবাংলাকেই বহন করতে হবে।
সূত্র আরও জানায়, বর্তমানে বিদ্যুৎ, শিল্প ও আবাসিকসহ বিভিন্ন খাতে দেশে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুট। তার মধ্যে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৭০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি থাকছে ১৩০ কোটি ঘনফুট। ওই সংকট সামাল দিতে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ। ওই লক্ষ্যে একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ ও ব্যবহার বিষয়ে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে পেট্রোবাংলা ও যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির মধ্যে চুক্তি হয়। ইতিমধ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণ শেষ করেছে এক্সিলারেট এনার্জি। ওই টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। আর এলএনজির প্রথম কিস্তিও ইতিমধ্যে দেশে পৌঁছে গেছে। গ্যাস সরবরাহের জন্য মহেশখালী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। আনোয়ারা থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রামের গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ করবে। আনোয়ারায় একটি সাব-স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। আনোয়ারা থেকে পতেঙ্গা হয়ে আরও একটি গ্যাস পাইপলাইনে ফৌজদারহাট পর্যন্ত যাবে এলএনজি গ্যাস। ফৌজদারহাট থেকে চট্টগ্রামের উদ্বৃত্ত গ্যাস নেয়া হবে জাতীয় গ্রিডে। এলএনজি সরবরাহের লক্ষ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল জাহাজ ভাড়া করা হয়েছে। জাহাজের ভাড়া, সেবা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে সরকার প্রতি বছর এক্সিলারেট এনার্জিকে ৭২০ কোটি টাকা প্রদান করবে। অর্থাৎ আমদানিকৃত এলএনজি তরলীকৃত অবস্থা থেকে গ্যাসে রূপান্তরসহ দৈনিক আনুষঙ্গিক ব্যয় প্রায় ২ কোটি টাকা।
এদিকে এ প্রসঙ্গে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খায়েজ আহমেদ মজুমদার জানান, এলএনজি সরবরাহ করবে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। কর্ণফুলী গ্যাস টিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড বিতরণ কোম্পানি হিসেবে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করবে। শুরুতে মে মাসের শেষদিকে গ্যাস সরবরাহ করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ২৩ জুন সরবরাহ করা হবে বলে নিশ্চিত হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরবরাহ না হওয়ায় দৈনিক ভিত্তিতে জাহাজ ভাড়া বাবদ ও গ্যাসের অপচয়জনিত কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, সে বিষয়ে আমি অবগত নই।
অন্যদিকে একই প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়জুল্লাহ জানান, কার্গো অপেক্ষায় রাখার জন্য পেট্রোবাংলার কোনো আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে না। কারণ দায়িত্ব এ সংস্থার নয়। এর দায় এক্সিলারেট এনার্জিই বহন করছে। পাইপলাইনের যে জটিলতা ছিল, তা সমাধান হয়েছে। ১৪ জুন এ বিষয়ে একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। আপাতত কোনো সমস্যা নেই। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাকি আছে। ওগুলো শেষে ঈদের পর গ্যাস সংযোগ দেয়া যাবে।