বাড়তি আয়ের আশায় ঈদের দিনে রাজধানীতে অপেশাদার কসাই

স্টাফ রিপোর্টার:

ঈদকে কেন্দ্র করে সবাই যখন স্বজনের টানে বাড়ি ফিরেছেন, ঈদের আনন্দঘন উৎসব মিলেছে প্রাণে, তখন কিছু মানুষ চলে আসেন ঢাকায়। দেশের অন্তত ১৫টি জেলা থেকে গরিব এই মানুষেরা রাজধানীতে আসেন বাড়তি কিছু আয়ের আশায়। কোরবানির পশু জবাই থেকে শুরু করে রান্নাঘর পর্যন্ত মাংস পৌঁছে দেওয়ার কাজটিও করেন তারা। তারা মূলত অপেশাদার ও মৌসুমী কসাই। কোরবানির পশুর তুলনায় রাজধানীতে কসাইদের সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় বাইরে থেকে আসা এই অপেশাদার কসাইরা হয়ে ওঠেন ঈদের দিনে নগরবাসীর ভরসা। ঈদুল আজহার দিন বুধবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, অলি-গলিতে দেখা গেছে এই অপেশাদার কসাইদের সরব উপস্থিতি।

রাজধানীর কাওরান বাজার, গ্রিন রোড, কাঁঠাল বাগান, কলা বাগান, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, ধানমন্ডি, পান্থপথ, কাঁটাবন, ইস্কাটন, মালিবাগ, মগবাজার এলাকার সড়কগুলোতে ঢাকার বাইরের অপেশাদার কসাইদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ঈদের দিন সকালে নগরবাসী যখন মসজিদ বা ঈদগাহের পথ ধরেন, ওই সময়টায় তারা ফুটপাতে বসে একপ্লেট খিচুরিতে নাস্তা সেরেছেন। প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পশু কোরবানির আর মাংস বানানোর। শেষ মুহূর্তের ধার দেওয়া হচ্ছিল চাপাতি, ছুরি, ও স্টিকে।

কেউ অপেক্ষা করছিলেন, কেউবা সরঞ্জাম প্রস্তুতে ব্যস্ত, নামাজ শেষেই শুরু হয় কসাইয়ের কাজ। এরকম কয়েকজন অপেশাদার কসাইয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের দিন পশু জবাই ও মাংস বানাতে তারা ঢাকার বাইরে থেকে আসেন। এদের মধ্যে যাদের সঙ্গে কথা হয়, তাদের বেশিরভাগই এসেছেন দিনাজপুর, জামালপুর, পঞ্চগড়, ময়মনসিংহ, বগুড়া, নওগাঁ, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, পুটয়াখালীসহ নানা জেলা থেকে। তাদের অনেকেই এসেছেন মঙ্গলবার রাতে, আবার ফিরে যাবেন ঈদের দিন সন্ধ্যায়।

অপেশাদার কসাইরা বলছিলেন, তারা গরিব, শুধুমাত্র কিছু বাড়তি আয়ের আশায় ঈদের দিন স্বজনদের ছেড়ে ঢাকায় পশু জবাই করতে এসেছেন। তবে অপেশাদার কসাইদের সঙ্গে রয়েছেন পেশাদার কসাইরাও। চার, পাঁচ, ছয় বা আট জনের টিমে একজন পেশাদার কসাই থাকেন নেতৃত্বের ভূমিকায়। কোনও কোনও অপেশাদার কসাইয়ের বাড়ি দূরের জেলায় হলেও সাভার, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ, আশুলিয়া এলাকায় বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও চলে আসেন কসাইয়ের সঙ্গে ‘খ্যাপ’ খাটতে। তাদের কেউ কেউ আগে থেকেই নগরীতে এসেছেন। অনেকে আবার বুকিংও দিয়ে রেখেছেন কয়েকটি গরু। অপেশাদারদের মধ্যে রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দরিদ্র কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রমজীবীদেরও দেখা যায়।

ঈদের দিন ভোরে কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টারের গেটে ঘুমঘুম চোখে কথা বলেন দিনাজপুর থেকে আসা কসাই জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমিসহ আমরা চারজন এসেছি পঞ্চগড় থেকে। গত রাতে আসছি। আমরা এপর্যন্ত চারটা গরু বুকিং দিয়েছি।’ প্রতিটি পশু জবাই ও মাংস বানাতে অপেশাদার কসাইরা পশুর মূল্যের হাজার প্রতি ১০০ টাকা পারিশ্রমিক নেন। আবার কেউ কেউ ১৫০ টাকাও দাবি করেন। কলাবাগানের বশিরউদ্দিন রোডে জামালপুর থেকে আসা কয়েকজন কসাই জানান, তারা গরুর প্রতি হাজারে ১৫০ টাকা করে নিয়ে থাকেন।

আশুলিয়া থেকে আসা কাঁচামাল ব্যবসায়ী মমিনুল হক জানান, তার গ্রামের বাড়ি জামালপুর জেলায়। তিনি আশুলিয়ায় ব্যবসা করেন। তবে ঈদ উপলক্ষে তারা আটজন এসেছেন জামালপুর থেকে। প্রত্যেকটি টিমে কাজ করেন চারজন করে। এই আট কসাইদের মধ্যে দু’জন পেশাদার রয়েছেন। মমিনুল হক বলেন, ‘প্রতিবছরই ঈদের আগের রাতে আমরা রাজধানীতে চলে আসি এবং দিনশেষে বাড়ির দিকে রওয়ানা হই। এরপর পরিবারের সঙ্গে ঈদ করি।’ অপেশাদার কসাইরা বলছিলেন, ঈদের দিন বিকাল তিনটা পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি গরু বানাতে পারেন তারা। সেক্ষেত্রে প্রত্যেকেই স্বল্প পারিশ্রমিক আর কোরবানিদাতার পক্ষ থেকে মাংস পেয়ে থাকেন। এই মাংস নিয়ে তারা গ্রামে ফেরেন।

মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের কসাই মুরাদ বলেন, ‘কোরবানির ঈদ আসার ১৫ দিন আগেই আমাদের পূর্ব-পরিচিত কাস্টমারদের বুকিং হয়ে যায়। ঈদের দিন প্রতি হাজারে ২০০ টাকা আর ঈদের পর হাজারে ১০০ টাকা করে নেই আমরা।’ বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রবিউল ইসলাম বলেন, ‘অনেকে চুক্তিতে কাজ করে থাকে। এতে কাস্টমার আর মাংস শ্রমিকদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকে। চুক্তিতে কাজ করলে মানুষ ন্যায্য দামে কোরবানি দিতে পারে। আমরা অনেক দিন ধরে চেষ্টা করে আসছি- আমরা চাচ্ছিলাম, এই দর নিয়মিতকরণের মধ্যে নিয়ে আসতে। প্রতিটা পশুর দামের বিপরীতে মাংস ব্যবসায়ীর খরচ নির্দিষ্ট নির্ধারণ করার কথা আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি।’