বিপরীত মতাদর্শের সমন্বয়ে গঠিত জোটবদ্ধ নির্বাচনে রাজনীতির মৌলিক কোনো পরিবর্তন হবে না

দৈনিক বজ্রশক্তির সাথে বিশেষ সাক্ষাৎকারে হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম

বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা স্পষ্ট দেখতে পারি যে, ধর্ম বর্তমান বিশ্বের ‘নাম্বার ওয়ান ইস্যু’। বিশ্ব রাজনীতি ও সামজিক প্রেক্ষাপট, উভয়ক্ষেত্রেই ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে ধর্মকে কেন্দ্র করে সংঘাত আমাদের কাছে নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের এখানেও ধর্মকে ব্যবহার করে স্বার্থ হাসিল করেছে বেশ কিছু স্বার্থান্বেষী মহল। আসন্ন নির্বচানেও এর প্রভাব পড়াটা বেশ স্বাভাবিক। এই বিষয়টি নিয়েই হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমের সাথে কথা বলেছেন দৈনিক বজ্রশক্তির সম্পাদক।

বজ্রশক্তি: বর্তমানে যারা ধর্মের মুখোশ পরে ধর্মকে বিকৃত করছে এবং ইসলামকে পুঁজি করে রাজনীতি করছে তাদের ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম: প্রথমেই আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। দেখুন আমরা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও সংস্কারমূলক একটি আন্দোলন। এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী পন্নী জমিদার পরিবারের যোগ্য উত্তরসূরী এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। দেখুন বর্তমানে আমরা যারা নিজেদের ইসলামের অনুসারী অর্থাৎ মুসলিম হিসেবে দাবি করি তাদের সর্বপ্রথম একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে রসুল যে দীন বা জীবনব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন সেটাই প্রকৃত ইসলাম। ইসলামের নামে বর্তমানে অনেক বিকৃতির উদ্ভব ঘটেছে যেগুলো আল্লাহর রসুলের প্রকৃত ইসলাম নয়। ইসলামের নামে বর্তমানে যে সন্ত্রাস, অপরাজনীতি ও স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা চলছে তা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম, অবৈধ। এই শেষ দীন এসেছে মানবজাতির মুক্তির জন্য, মানবতার কল্যাণের জন্য। সুরা বাকারায় (১৭৩-১৭৬) যদি দেখেন তবে স্পষ্ট দেখতে পাবেন মহান আল্লাহ দীনের কাজের বিনিময় গ্রহণ করা, আয়াত গোপন করা ও ইসলামের নামে স্বার্থ উদ্ধার করাকে আগুন খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। বিপদাপন্ন হলে, উপায় না থাকলে মৃত জন্তু ও শুকর খাওয়ার বৈধতাও তিনি দিয়েছেন কিন্তু এই একটি ব্যাপারে আল্লাহ অনমনীয়। আগুন খাওয়ার সাথে তুলনা করেই তিনি ক্ষান্ত হননি তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে যারা এই কাজ করবে তিনি তাদের সাথে হাশরের দিন কথা বলবেন না এবং তাদের পবিত্রও করবেন না।
ধর্মের নামে স্বার্থ উদ্ধার, অপরাজনীতি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড, ধর্মব্যবসা ইত্যাদি সকল কাজ অবৈধ (Illegal) নিষিদ্ধ, হারাম। যারা ইসলামের জন্য কাজ করবেন তারা বিনিময় গ্রহণ করবেন আল্লাহর কাছ থেকে। তারা আল্লাহর বিধি-বিধান, আদেশ-নিষেধগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরবেন নিঃস্বার্থভাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য সারা পৃথিবীতে এই ধর্মকে কেন্দ্র করে প্রত্যেকেই তাদের স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত। এই স্বার্থান্বেষী মহলের জন্য সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছে এবং ধর্মের প্রতি তাদের বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। শুধুমাত্র আল্লাহকে পাওয়ার জন্য, জান্নাতে যাওয়ার জন্য ধর্মব্যবসায়ীদের পিছনে তারা কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে কিন্তু ফলত তারা কিছুই পায় নি। তাদের এই অর্থে সাধারণ মানুষের কোন উপকার হয়নি বরং তা ধর্মব্যবসায়ী ও স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামের নামে আরেক গোষ্ঠী অপরাজনীতিতে ব্যস্ত এবং তারা মানুষের ঈমানকে ব্যবহার করে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করেছে এবং করছে। এছাড়াও ইসলামকে ব্যবহার করে একদল জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড করছে যার ফলে দুনিয়াজোড়া ইসলামের শুধু বদনামই হচ্ছে।
আমরা হেযবুত তওহীদ বিগত ২৩ বছর ধরে মানবজাতিকে এই সকল ফেরকা-মাজহাব, দল-উপদল থেকে বেরিয়ে এসে এক জাতি হবার আহ্বান করে আসছি। আমাদের এই আহ্বানে অনেকেই সারা দিয়েছে এবং আমরা তাদের নিয়েই একজোট হয়ে সকল প্রকার অন্যায় তথা ধর্মব্যবসা, অপরাজনীতি, সন্ত্রাস, সাম্প্রাদায়িকতা, জঙ্গিবাদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে আদর্শিক সংগ্রাম করে যাচ্ছি। আমাদের এই সংগ্রামের ফলে বহুবার আমাদের উপর হামলা করা হয়েছে, আমাদের কাজে বাঁধা দেয়া হয়েছে। আমার বাসায় চারবার বড় আকারের হামলা হয়েছে। আমাদের দুইজন ভাইকে প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংসভাবে জবাই করে হত্য করা হয়েছে, চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে, পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। অপপ্রচার চালানো হয়েছে আমরা নাকি খ্রিষ্টান হয়ে গিয়েছি, আমাদের বিরুদ্ধে কথা বললে, আমাদের উপর নির্যাতন চালালে নাকি আল্লাহ খুশি হবেন। এই যে ধর্মীয় অনুভূতিকে ভুল খাতে ব্যবহার করে, মানুষের ঈমানকে জিম্মি করে ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করা হলো তা মোটেও ইসলামসম্মত নয়। এটা আল্লাহর রসুলের প্রকৃত ইলামের নীতি বহির্ভূত কাজ।
তাহলে এদের বিরুদ্ধে আমাদের করণীয় কী? সরকার এদের বিরুদ্ধে যথেষ্ঠ সচেতন এবং তারা শক্তিপ্রয়োগ করে এদের দমাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা বলছি শুধুমাত্র শক্তি প্রয়োগে সন্ত্রাসাবাদ ও জঙ্গিবাদ নির্মূল সম্ভব নয়, হ্যাঁ, সাময়িক নিস্কৃতি লাভ হতে পারে। পরিসংখ্যান খুলে দেখুন পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোও শুধু মাত্র শক্তি প্রয়োগ করে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে পারেনি। তারাই এখন বলছে বিপরীত আদর্শ (Counter narrative) প্রয়োজন। আমরা সেই আদর্শকেই ধারণ করেছি যে আদর্শ দ্বারা এই সমস্যার নিষ্পত্তি সম্ভব, সেই আদর্শ হচ্ছে প্রকৃত ইসলামের আদর্শ। আমরা কোর’আন-হাদিস-যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করে দিয়েছি যে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ইসলামে বৈধ নয়।
জনগণকেও এ ব্যাপারে সচেতন করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপ অত্যাবশ্যক। সরকার এই বিষয়টি নিয়ে সজাগ এবং যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা এই কাজের পিছনে বিপুল অর্থ ও শ্রম ব্যায় করে। আলেমদের দিয়ে জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করার পাশাপাশি সরকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো জায়গাতেও তাদের নিয়ে সম্মেলনের ব্যবস্থা করেছে। আপনারা গণমাধ্যমের ব্যক্তিবর্গ রয়েছেন আপনারা নিশ্চয়ই জানেন বিভিন্ন গণমাধ্যমও আলেমদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে যাতে জনগণের মধ্যে এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি হয়। আমি সরকার ও গণমাধ্যমকে আহ্বান করবো আমাদের নিয়ে অনুষ্ঠান করার জন্য। আমরা জাতির স্বার্থে, মানবতার কল্যাণে নিজেদের সব কিছু কোরবানি করে সংগ্রাম করে যাচ্ছি। আমরা এর কোন বিনিময় চাই না, এর কোনো বিনিময় আশাও করি না কারণ এর বিনিময় আমরা আল্লাহর কাছ থেকে নিব। আমাদের কোন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যও নেই। আমরা এমামুয্যামানের আদর্শে অনুপ্রাণিত, উজ্জীবিত। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, সর্বপ্রথম আমাদের পরিচয় আমরা মানুষ, আমরা আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি। তিনি আমাদের উপলব্ধি করতে শিখিয়েছেন যে এই দেশ ও মাটি আমাদের। গোটা মানবজাতি এক আদম হাওয়ার সন্তান এবং এটিই আমাদের সর্বপ্রথম পরিচয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য হোক কিংবা আমাদের এই উপমহাদেশ, যেখানেই অশান্তিতে থাকুক না কেনো তারা সবাই আমাদেরই ভাই, আমাদেরই বোন। এখানে ধর্ম-বর্ণ-জাতি কোনোটাই মূখ্য নয়। আমরা সবাই মানুষ এবং আমাদের প্রধান কর্তব্যই হচ্ছে সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সেই লক্ষ্যে সংগ্রাম করে যাওয়া। তাহলে আমাদের ইহকাল ও পরকাল উভয়ই সুন্দর হবে। এই বার্তাই আমরা আমাদের সাধ্যমতো পৌঁছে দিচ্ছি।
আমরা আশা করছি অতি অল্প দিনেই ধর্মপ্রাণ সাধারণ জনতা আমাদের এই আদর্শ বুঝবেন, হৃদয়ঙ্গম করবেন এবং ধারণ করবেন। আপনি জানলে খুশি হবেন ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের লাখ লাখ জনতা আমাদের এই আদর্শিক বক্তব্যের সাথে ঐক্যমত পোষণ করেছে এবং অনেকেই তাদের মূল্যবান সময় ব্যয় কর আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করছে।

বজ্রশক্তি: আপনাদের নীতি-আদর্শ ও কোর’আন হাদিসের আলোকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কীরকম সরকার হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম: দেখুন এ বিষয়ে যদি মতামত দিতেই হয় তবে একটু বিস্তারিত বলা প্রয়োজন। একটি বৃক্ষের মতো একটি সিস্টেম বা ব্যবস্থারও বিভিন্ন শাখা প্রশাখা থাকে। শিক্ষাব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, শাসন ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়েই একটি ব্যবস্থা গঠিত হয়। আমরা প্রায় দুইশত বছর ব্রিটিশদের অধীনে ছিলাম যারা প্রায় দুইশত বছর অর্ধেক বিশ্বকে শাসন ও শোষণ করেছে। এই দুইশ বছর তারা গণতন্ত্রের কথা একবারও তুলেনি। তারা বন্দুকের নলের উপর নিজেদের শাসন পরিচালনা করেছে। তাদের মূল লক্ষ্যই ছিল নিজেদের দেশকে সমৃদ্ধ করা। তাদের এই শাসনের নামে করা শোষণের ফলে দুর্ভিক্ষে পতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে প্রায় তিন কোটি ভারতবাসী। কিন্তু আমাদের অবস্থা তো এমন ছিল না। আমাদের গোলাভরা ধান ছিল, পুকুরভরা মাছ ছিল, গোয়ালভরা গরু ছিল। এরাই পরবর্তীতে দুইটি বিশ্বযুদ্ধ ঘটিয়ে প্রায় চৌদ্দ কোটি বনী আদমকে হত্যা করেছে। এরই মাঝে মুক্তিকামী জনতারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বিশ্বযুদ্ধে হওয়া ক্ষয়-ক্ষতির ফলেই হোক বা স্বাধীনতাকামীদের চাপেই হোক তারা একসময় এই ভূখণ্ড ছেড়ে নিজেদের দেশে ফিরে যায়। কিন্তু চলে যাওয়ার সময় তারা তাদের প্রণিত ব্যবস্থা রেখে যায় এবং আমরা তা আমাদের স্বাধীন সার্বোভৌম দেশে বজায় রাখি। সেই কামলা তৈরির আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে আমরা আজও বের হতে পারি নি। তারা দ্বৈতনীতির শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করে। একদিকে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে শুধুমাত্র কেরানি তৈরির শিক্ষা দেয়া হয়। ব্রিটিশদের এরূপ শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন প্রয়োজন ছিল কারণ এত বড় ভারতবর্ষকে শাসন করার জন্য যে পরিমাণ কর্মচারী প্রয়োজন তা নিজেদের দেশ থেকে এনে পোষানো যেত না। এই কামলা তৈরির আমলাতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ফলে অর্ধেক জনগোষ্ঠী কামলা হওয়ার পাশাপাশি আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপরে পরিণত হলো। অপরদিকে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের ফলে অর্ধেক জনতা জাতির বোঝায় পরিণত হলো এবং তারা ধর্মান্ধ ও ধর্মব্যবসায়ী হয়ে উঠল। সেখানে না তাদের প্রকৃত ইসামের জ্ঞান প্রদান করা হয় না তাদের আল্লাহর হুকুম মানার শিক্ষা দেয়া হয়। জাতির উন্নয়নে তারা কোন ধরনের ভূমিকাই রাখতে পারে না। বর্তমানে আমাদের জনগণের জাতিগত চেতনা হারিয়ে গিয়েছে। এমন জাতি সৃষ্টি হয়েছে যাদের মধ্যে মানবতার কল্যাণে ভাবার সময় নেই, যাদের মধ্যে দেশপ্রেম নেই, ‘না খেয়ে থাকবো তবুও দেশের ক্ষতি করবো না’- এমন মানসিকতা নেই।
আমি স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখি নি। আমার জন্ম হয়েছে ‘৭২ সালের শেষে অর্থাৎ স্বাধীনতার পর। সার্টিফিকেট অনুযায়ী আমার জন্মদিন পহেলা জানুয়ারী ১৯৭৩ সালে। জ্ঞান হবার পর থেকেই আমি দেখে এসেছি স্বার্থের রাজনীতি, হানাহানির রাজনীতি। এক দল কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ক্ষমতায় আসে ও অপরদল তাদের ক্ষমতা থেকে নামানোর জন্য উঠে পড়ে লাগে। যেদিন ক্ষমতায় যায় তার পরদিন থেকেই বিরোধী দল হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও পোড়াও ইত্যাদি জাতি বিনাশী কর্মকাণ্ড শুরু করে। গত পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের পর দেশে যে ধ্বংসযজ্ঞ চলল তাতে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনের ব্যাপারেও আমরা দেখতে পাচ্ছি সরকার দল, বিরোধী দল, ইসলামিক দল ও বামপন্থী দলগুলোর অনেকেই প্রবাসের দৌড়াচ্ছে। কেউ দিল্লি যাচ্ছে, কেউ ইউরোপে যাচ্ছে। অনেকেই আবার জাতিসংঘে কড়া নাড়ছে। সেখানে আমাদের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমাদের সংসদ এখানে, বিচার বিভাগের কোর্টগুলো এখানে, আমাদের প্রশাসনিক সকল অফিস আদলাতও এখানেই তবে এত দৌড়-ঝাঁপ কেন? আমরা কী এক সাথে বসে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারি না?
আমার কথা হচ্ছে, আমরা এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারছি না। এর কারণ হচ্ছে সেই ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয়ব্যবস্থা। আসন্ন নির্বাচনে অনেকে বিভিন্ন দলের সাথে মিলে জোট তৈরি করছে। কেউ বামপন্থীদের টানছে কেউবা ইসলামী দলগুলোকে নিজেদের সাথে রাখছে। অনেক হিসাব-নিকাশ হচ্ছে। কী পরিমাণ টাকা খরচ করছে তা আপনারা, গণমাধ্যমের লোক, আমার থেকে ভালো জানবেন। কোটি টাকা খরচ করে এমপি হচ্ছে, মন্ত্রী হচ্ছে, সংসদ সদস্য হচ্ছে। যেনো এটাই একমাত্র লক্ষ্য।
একদিকে তারা এভাবে কোটি টাকা খরচ করে ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে আর অপরদিকে আমার দেশের নিরীহ মানুষ মারা যাচ্ছে। কিছুদিন আগেই খবরের কাগজে একটি খবর দেখতে পেলাম যেখানে লিখেছে, বেকারত্বের হতাশায় খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ রিসার্চ এন্ড টেকনোলজির সাবেক (শিক্ষাবর্ষ ২০০৯/১০) ছাত্র (সৈকত হোসেন মণ্ডল) আত্মহত্যা করেছে। নিজেই বিবেচনা করুন একদিকে কোটি কোটি টাকা উড়ছে অপর দিকে খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গা থেকে পড়াশুনা করা একজন ছাত্র বেকারত্বের জ্বালায় আত্মহত্যা করছে। ফিসারিজ প্রকল্পের নামে আমাদের দেশে কোটি কোটি টাকা লুট হয়েছে, প্রকল্প গঠন হয়নি। দুগ্ধজাত দ্রব্যের উপর বহু প্রকল্প পরিকল্পিত হয়েছে কিন্তু তার আদৌ কোনো বাস্তবায়ন ঘটেনি। এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা!
কাজেই জাতিকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের মুক্তি সম্ভব নয়। আমি আমার জনসভায় বহুবার বলেছি সাদ্দাম হোসেন ইরাককে রক্ষা করতে পারেনি, কর্নেল গাদ্দাফি লিবিয়াকে রক্ষা করতে পারেনি, বাদশাহ জহির আফগানিস্তান রক্ষা করতে পারেনি। আজকে সাম্রাজ্যবাদী অস্ত্রব্যবসায়ীরা আমাদের এই জন্মভূমির দিকে শ্যেন দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছে। যদি আমরা এখনই এই হানাহানির রাজনীতি ও স্বার্থের দ্বন্দ বন্ধ করতে না পারি তবে আমাদের দেশকেও তারা তাদের অস্ত্রব্যবসার ঘাঁটি হিসেবে তৈরি করবে, আমাদের দেশের অবস্থাও হবে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের মতো। কাজেই এখন আমাদের মাটি রক্ষার কথা ভাবতে হবে, এটাই এখন আমার কাছে মূখ্য বিষয়। আপনারা একটা নির্বাচন করুন বা হাজারটা, ক্ষমতায় সরকার দল আসুন বা বিরোধী দল সেটা আমার বিবেচ্য বিষয় নয়।
আমাদের প্রস্তাবনা হচ্ছে, যা করার অতিদ্রুত করতে হবে। আমি অর্থনীতির ছাত্র নই, অর্থনীতির পণ্ডিতও নই, অর্থনীতির জটিল মার-প্যাঁচ আমি বুঝি না কিন্তু এতটুকু বুঝি যে যেভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ফলে সারা বিশ্বের সম্পদ একিভূত হয়ে কয়েকজন মানুষের মধ্যে কুক্ষিগত হচ্ছে তাতে আমাদের অবস্থাও ভেনিজুয়েলা থেকে খুব একটা ভালো হবে না। তাই এখনই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হওয়াটা এখন জরুরী হয়ে পড়েছে। ফেরকা-মাজহাব, দল-উপদল, ধর্ম-বর্ণ সবকিছু ভুলে আজ একজন নেতার অধীনে ইস্পাত কঠিন ঐক্যবদ্ধ হতে না পারলে আসন্ন সংকট থেকে পরিত্রাণ সম্ভব হবে না। নির্বাচনকে নিয়ে দ্বন্দ আগে দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল কিন্তু এখন তা গ্রাম-গঞ্জ, পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে গিয়েছে। কোনো একসময় এই গ্রামগুলোতে, পাড়া-মহল্লায় সৌহার্দ্য ও সম্পৃতি ছিল ঈর্ষণীয় আর আজ নির্বাচনের প্রভাবে সেখানকার অবস্থা কী দেখে আসুন। গলাগলি আজ গালাগালিতে রূপ নিয়েছে। কাজেই নির্বাচনের ফলে জাতির কাঠামগত, মৌলিক কেনো পরিবর্তন হবে না।

বজ্রশক্তি: আপনাদের কোনো উন্মুক্ত স্থানে জনসভা করার ইচ্ছা রয়েছে কি?
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম: আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না ইতোমধ্যে আমরা দেড় লক্ষ জনসভা, আলোচনা সভা, পথসভা, সম্মেলন, র‌্যালি ইত্যাদির আয়োজন করেছি। মন্ত্রী থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পর্যন্ত এই সকল অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছে। এছাড়াও দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সাথেই আমরা কাজ করেছি। আমি প্রায় ৫০টিরও অধিক জনসভায় প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দিয়েছি এবং আমাদের হেযবুত তওহীদের আদর্শ ও প্রকৃত ইসলামের রূপরেখা সাধারণ জনগণের সামনে তুলে ধরেছি। আমাদের ছোট একটি সম্মেলন করতে গেলেও অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখিন হতে হয়। আমরা দশটি জনসভার আবেদন করলে একটির অনুমোদন দেয়া হয়। এরপরও এমন অনেকসময়ই হয়েছে যে জনসভার প্রস্তুতি গ্রহণ করেও আমরা শেষ মূহুর্তে জনসভা করতে পারি নি। ধর্মব্যবসায়ী ও কুচক্রী মহলের ইন্ধনে বেশিরভাগ জনসভার অনুমোদনই বাতিল হয়েছে। কিন্তু তবুও আমরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে জনসভা ও সম্মেলন করার চেষ্টা করছি, সম্মেলন করছি এবং আমাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি।

বজ্রশক্তি: আপনাদের কাজের ব্যাপারে আপনারা কতটুকু আশাবাদী?
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম: দেখুন আমরা সত্য প্রচারে সংগ্রামে নেমেছি এবং এ কাজটি করার জন্য আমরা সকল ধরনের কোরবানি করতে রাজি কারণ আমরা জানি আমরা যে কাজ করছি তা আল্লাহর জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য। আমরা অবশ্যই আমাদের কর্মকাণ্ডে আশাবাদী এবং আমাদের যদি সুযোগ দেয়া হয় তবে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা আমাদের দেশকে পুরো বিশ্বের সামনে একটি আদর্শে পরিণত করতে পারবো। “Bangladesh would become a roll model for all other countries.” জঙ্গিবাদ ইস্যুতে যখন বিশ্ব উত্তাল তখন আমাদের দেশেও সেই ঝড়ের প্রভাব পড়ছিল। সেই সময়ে আমাদের হাজার হাজার কর্মী দিন-রাত মাঠে খেটে, অক্লান্ত পরিশ্রম করে কোর’আন হাদিসের তথ্য-যুক্তি দেখিয়ে সাধারণ জনগণকে সচেতন করেছে, তাদের সামনে প্রমাণ করেছে যে জঙ্গিবাদ ইসলামে নিষিদ্ধ। আমাদের অবদানকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আমরা রাজনীতি করি না, রাজনৈতিক দলগুলোর মতো ক্ষমতায় আসার জন্য জ্বালাও পোড়াও করি না। আমাদের সম্পর্কে কিছু ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণিত নেতিবাচক ধারণা চালু করেছে কারণ আমরা তাদের মুখোশ উন্মোচিত করছি এবং কিছু সাংবাদিক তাদের হলুদ সাংবাদিকতার মাধ্যমে আমাদের জনগণের থেকে দূর করে দিয়েছে। তবে এখন আমরা যথেষ্ট আশাবাদী যে খুব শীঘ্রই বাংলার এই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এই মহাসত্য উপলদ্ধি করবে এবং সীসা গলানো প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে সকল অন্যায়, অত্যাচার, অপরাজনীতি সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। আমার বিশ্বাস সেদিন বেশি দূরে নয়।