মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
সালাম গ্রহণ করবেন। রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শত ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের মতো সাধারণ মানুষের এই চিঠি আপনার দৃষ্টিগোচর হবে কি না জানি না। তবু অনিবার্য কারণে আপনার কাছে চিঠিটি পৌঁছানোর জন্য পত্রিকার আশ্রয় নিতে হলো। বহুবার বহু সেমিনারে, মতবিনিময় সভায়, জনসভায় আমরা এ বিষয়টি তুলে ধরেছি, আপনার কার্যালয়ে গিয়েও আমরা বহুবার আপনাকে বিভিন্ন বিষয়ে লিখিতভাবে অবগত করার চেষ্টা করেছি। বিষয়টি বর্তমান বৈশ্বিক সংকট জঙ্গিবাদ নিয়ে। যেহেতু এর সঙ্গে গোটা জাতির ভাগ্য জড়িত, সবার অস্তিত্বের প্রশ্ন তাই একজন নাগরিক হিসাবে বিবেকের তাড়নায় বিষয়টি আপনাকে অবগত করার জন্য উদ্যোগী হয়েছি।

আপনি অবগত আছেন যে, এই জঙ্গিবাদকে ইস্যু বানিয়ে সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিগুলো একটার পর একটা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশকে নিয়েও স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বহুমুখী ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। বিষয়টি আপনি বহুবার নানা প্রসঙ্গে গণমাধ্যমের সামনে উল্লেখ করেছেন। জঙ্গিবাদের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছে এবং কারা মুসলমানদের রক্তের বিনিময়ে অস্ত্র ব্যবসা করছে সে বিষয়েও আপনার সাহসী উচ্চারণ আমরা শুনেছি। আমরা হেযবুত তওহীদ একটা অরাজনৈতিক আন্দোলন যার প্রতিষ্ঠাতা এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী পন্নী পরিবারের সন্তান। তাঁর পূর্বপুরুষরা সুলতানী যুগে বৃহত্তর বঙ্গের স্বাধীন সুলতান ছিলেন এবং তাঁর পূর্বপুরুষ সুলতান দাউদ খান কররানি ১৫৭৬ সনে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য মোঘল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। এদেশের শিক্ষাবিস্তারে, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এই পরিবারের নাম সোনালী হরফে লেখা। মাননীয় এমামুয্যামান নিজেও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন বিপ্লবী কমান্ডার ছিলেন। ১৯৬৪ সনে তিনি স্বতন্ত্র পদে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ২০০৯ সালে আপনার সরকারের প্রতি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আদর্শিক লড়াইয়ের প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন যার অনুলিপি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ১৮টি দফতরেও প্রেরণ করা হয়েছিল। সেই প্রস্তাবনায় তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, জঙ্গিবাদ পৃথিবীর অন্যান্য সন্ত্রাসবাদী ঘটনার মতো নয়। কারণ এটা হলো সম্পূর্ণরূপে ধর্ম দ্বারা অনুপ্রাণিত। এর সম্পর্ক পরকালের জান্নাত জাহান্নামের সঙ্গে। যারা এটা ঘটাচ্ছে তারা প্রথমত বিশ্বের মুসলমান জাতির বর্তমান দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতিকে সামনে এনে ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে কোর’আন হাদিসের বিভিন্ন রেফারেন্স দিয়ে কথিত ‘জেহাদে’ উদ্বুদ্ধ করে তুলছে। সরকারগুলো চেষ্টা করছে শক্তি দিয়ে এই সন্ত্রাসবাদকে দমন করতে কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে সর্বত্র জঙ্গিবাদের প্রকোপ অতীতের তুলনায় আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ করে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করে ফেলেছে, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে ফেলেছে কিন্তু জঙ্গিবাদ নির্মূল হয় নি। ২০০৯ সনেই তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা স্বীকার করেছিলেন যে “কেবল বুলেট আর বোমা দিয়ে জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করা যাবে না, অন্য উপায় খুঁজতে হবে।” মাননীয় এমামুয্যামান লিখেছিলেন, “জঙ্গিবাদ মোকাবেলার জন্য শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি ইসলামের সঠিক আদর্শটি তুলে ধরে জঙ্গিবাদের অসারতা মানুষের সামনে পরিষ্কার করে দিতে হবে। তাহলে জান্নাতের আশায় কেউ আর ঐ ভুল পথে পা বাড়াবে না। কেবল জঙ্গিবাদ থেকে বিরত হতে আহ্বান করলেই হবে না, জান্নাতে যাওয়ার সঠিক পথটিও মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। এই কাজটি ইনশাল্লাহ হেযবুত তওহীদ করতে পারবে।”
এখন ২০১৭ সাল। জঙ্গিবাদকে কেন্দ্র করে গোটা মানবজাতির অস্তিত্ব চরম সংকটে পড়েছে। এ যাবৎ আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমাটি আফগানিস্তানে প্রয়োগ করে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের দেশের গোয়েন্দা প্রধানসহ চিন্তাশীল নাগরিকগণ, সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমর বিশেষজ্ঞ, জাতিসংঘ মহাসচিব, সাবেক সিআইএ প্রধান, জঙ্গিবাদের মোকাবেলা করছেন এমন রাষ্ট্রনায়কগণও একমত যে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হলে একটি পাল্টা আদর্শ বা কাউন্টার ন্যারেটিভ লাগবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, “জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার প্রচার করে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।” এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হলো, সেই প্রকৃত ইসলামটি কোথায় আছে এবং কে সেটা তুলে ধরবে? আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে এই কথাগুলো মানুষ এখন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মুখ থেকে শুনতে পাচ্ছে। আমরা সাধারণ মানুষের কাতারে থেকে বিগত বছরগুলোতে এ কথাগুলোই হাজার হাজার বার বলে এসেছি। প্রশ্ন হতে পারে, আমরা কেন উদ্যোগী হয়ে এ কথাগুলো বলছি? এক্ষেত্রে আমাদের দায়বদ্ধতা হচ্ছে এই যে, ঐ পাল্টা আদর্শ যার প্রয়োজনীয়তা এখন সবাই উপলব্ধি করছেন, সেই আদর্শটা আমাদের কাছে আছে। সেটা মহান আল্লাহ অতীব দয়া করে এই মাটিতে দান করেছেন। আমরা লক্ষ লক্ষ পত্রিকা, পুস্তিকা, ম্যাগাজিন, বই প্রকাশ করে, জনসভা, সেমিনার, পথসভায়, ঘরোয়া বৈঠকে, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে দেশের সর্বত্র, মাঠে-ঘাটে, গ্রামে-গঞ্জে, নগরে-বন্দরে রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, শীত উপেক্ষা করে মানুষের সামনে এ কথাটিই বলে এসেছি। আমরা যেদিন থেকে মাঠে নেমেছি সেদিন থেকে আর এক দিনের জন্যও মাঠ থেকে উঠি নি, এই ভয়াবহ সংকটের বিরুদ্ধে, ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের সম্পূর্ণ সামর্থ্য দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা বহুবার জঙ্গিবাদী মনোভাব পোষণ করে এমন গোষ্ঠীর দ্বারা এবং যারা এদেশে ধর্ম নিয়ে অপরাজনীতি করে তাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি, আহত হয়েছি, আমাদের অনেককে নির্মমভাবে হত্যাও করা হয়েছে। তবু আমরা দমে যাই নি। এ পর্যন্ত আমরা ৮৫ হাজারেরও বেশি গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করেছি যার সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান আমাদের কাছে আছে। এ কাজে স্থানীয় অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধিরা আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করে এসেছেন। তবে আমাদের কাজে সহযোগিতা করার জন্য সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতি (ঈড়হংরংঃবহঃ চড়ষরপু) না থাকায় বিড়ম্বনার শিকারও প্রতিনিয়ত হচ্ছি। যেখানে আমরা দশটা প্রোগ্রাম করতে পারতাম সেখানে একটার অনুমতি মিলছে। আমাদের জানামতে সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে, নিজেদের জীবন সম্পদ বিলিয়ে দিয়ে জাতির কল্যাণে, দেশের মানুষের জন্য এমন উদ্যোগ এই দেশে আর নেই, পৃথিবীতেও দ্বিতীয়টি আছে কিনা সন্দেহ। আর হেযবুত তওহীদ এমন একটি আইন মান্যকারী আন্দোলন যার কর্মীরা বিগত ২২ বছরে দেশের একটি আইনও ভঙ্গ করে নি, একটি অপরাধও করে নি। এটা আমাদের মৌখিক দাবি না, এটি সর্ব আদালত কর্তৃক স্বীকৃত সত্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো আমরা এই কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দ্বারা অকারণে হয়রানির শিকার হচ্ছি। আপনি বলছেন জনগণকে এগিয়ে আসতে, আমরা এগিয়ে গেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাত্তা দেওয়া হয় না, অহেতুক সন্দেহ করে উল্টো বিড়ম্বনার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়।
যাহোক সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, সরকার দুটো উপায়ে জঙ্গিবাদকে মোকাবেলার চেষ্টা করছেন। প্রথমত শক্তি দিয়ে, কঠোর থেকে কঠোরতর আইনী পদক্ষেপের মাধ্যমে জঙ্গিবাদীদেরকে দমন করার চেষ্টা করছেন। এটা লাগবে, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু শুধু শক্তি প্রয়োগ করা হলে তাদের পথভ্রষ্ট ঈমানী চেতনা আরো শানিত হবে। তাই সরকার দ্বিতীয় যে পদ্ধতিটি নিয়েছেন তা হলো বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অন্যান্য আলেম ওলামা, মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষকদেরকে উদ্বুদ্ধ করছেন। তারা ওয়াজ করছেন, ফতোয়া দিচ্ছেন, টিভিতে বিবৃতি প্রদান করছেন। জঙ্গিবাদীদের ডি-মোটিভেটেড বা নিরুৎসাহিত করতে এটি একটি ভালো উদ্যোগ তবে এই উদ্যোগটি যারা বাস্তবায়ন করবেন তারা যদি সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসতেন তবে তা কার্যকর ও ফলপ্রসূ হতো। এখানেই আমাদের কথা। আপনি বর্তমান বিশ্বে একজন বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে খ্যাত, তাই আমাদের বিশ্বাস আমাদের যুক্তি ও অভিমত আপনি অন্তত বিবেচনা করবেন। আমাদের এই অভিমত প্রদানের নেপথ্যে কোনো স্বার্থ বা অভিসন্ধি নেই। একান্তই দেশ ও মানুষের কল্যাণচিন্তা দ্বারা প্রণোদিত হয়ে লিখছি। তাছাড়া জাতির একটি অংশ বিপথগামী হয়ে নিজেদেরকে ধ্বংস করছে এবং দেশে বিপর্যয় ডেকে আনছে- এ বিষয়টি আমাদের খুবই ব্যথিত করছে। একই সাথে মাতৃভূমি ও পবিত্র ধর্ম ইসলামকে নিয়ে যে বহুমুখী ষড়যন্ত্র চলছে সেখানে সরকারের সহযোগিতায় এগিয়ে আসাকে দায়িত্ব মনে করেই আমরা আপনার সামনে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে উদ্যোগী হয়েছি।
১. আপনি নিশ্চয়ই জানেন, তার কথাই ফলপ্রসূ হয় যে তার নিজ কথা আত্মা থেকে বিশ্বাস করে এবং যেটা সে নিজে কাজে পরিণত করে। যে উপদেশের মধ্যে অর্থ বা কোনো প্রকার স্বার্থ জড়িত থাকে সেই উপদেশ কখনও কার্যকর হয় না। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যারা ইসলামের রেফারেন্স দিয়ে কথা বলবেন জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা থাকাটা জরুরি। তারা কোনো স্বার্থ হাসিলকারী গোষ্ঠী হলে, ধর্মব্যবসায়ী হলে, টাকার কাছে আত্মবিক্রয়কারী হলে সে চরিত্র মানুষের কাছে গোপন থাকে না। ফলে মানুষ তাদের ওয়াজের দ্বারা প্রভাবিত হয় না। আর জঙ্গিবাদীদের তো প্রভাবিত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাই যিনি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন তাকে দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করতে হবে। তিনি ধর্মের নামে কোনো বিনিময় নিতে পারবেন না। নিলে তার কথা ফলপ্রসূ হবে না, মানুষ নেবে না। এ পর্যন্ত আমরা দেখেছি একটি শ্রেণি ধর্মের নামে কেবল স্বার্থই হাসিল করছেন। তারা বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পেশা সৃষ্টি করে নিয়েছেন যা টিকিয়ে রাখার জন্য আন্দোলন করে দাবি আদায় করেন। বিভিন্ন ধরণের ইস্যু সামনে এনে তওহীদী জনতা নাম দিয়ে হাজার হাজার ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে উত্তেজিত করে দিয়ে বিভিন্ন ঘটনা ঘটিয়েছেন। কেউ ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করছে, কেউ রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করছে, কেউ প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ উদ্ধার করছে। এখানে ইসলামের স্বার্থ রক্ষা কিংবা সাধারণ মানুষের কল্যাণ তাদের উদ্দেশ্য নয়। প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার দরুণ মানুষ এদেরকে ইসলামের কর্তৃপক্ষ মনে করে। তথাপি তাদের ওয়াজের কোনো প্রভাব মানুষের উপর নেই। তারা যদি বলে সুদ খেও না, ঘুষ খেও না, দুর্নীতি করো না, ব্যভিচার করো না, দেশের ক্ষতি করো না, অপরাজনীতি করো না, সন্ত্রাসী চাঁদাবাজি করো না, পণ্যে ভেজাল দিও না, মাপে কম দিও না- কেউ তাদের কথা শুনবে না। এর প্রমাণ- ওয়াজ তো কম হচ্ছে না, প্রতিবছর ওয়াজকারীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কিন্তু তাদের এই নসিহতে মানুষ কতটুকু পরিশুদ্ধ হচ্ছে সেটা অপরাধের পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝা যায়। অর্থাৎ তাদের উপদেশে ফল হচ্ছে না। কারণ যাদের উপদেশে স্বার্থ থাকে এবং যারা নিজেরা সত্যের উপর দণ্ডায়মান নন তাদের উপদেশ প্রাকৃতিকভাবেই ব্যর্থ হয়। সরকারের কঠোর অবস্থান না থাকলে বরং তারাই বহু আগে এ দেশে পাকিস্তান, সিরিয়া, আফগানিস্তানের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ফেলত।
তাই সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে তাদের কোনো কথাই কাজে আসবে না। হ্যাঁ, তারা পারেন। কী পারেন? একটি জিনিস পারেন তা হলো তারা কিছু সময়ের জন্য একটি উন্মাদনা, জোশ সৃষ্টি করে দাঙ্গা, ফেতনা ঘটাতে পারেন। এই ফেতনার শিকার আমরা হেযবুত তওহীদ বার বার হয়েছি, নোয়াখালীতে আমাদের দুজন ভাইকে খ্রিষ্টান ফতোয়া দিয়ে জবাই করা হয়েছে। তারপর তার দায় তওহীদী জনতার উপর চাপিয়ে দিয়ে জনতার আড়াল হয়েছে। সেই দাঙ্গা সৃষ্টি করেছে কয়েকটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক অরাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তারা পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে দলীয় ক্যাডারদের এনে, ধর্মবিশ্বাসী মুসল্লীদের ঈমানকে ভুল খাতে প্রবাহিত করে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, লুটপাট করার পর কয়েকটি বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। সাধারণ জনগণের মধ্যে যারা এতে অংশ নিয়েছিল ঘটনার পরপরই ভুল বুঝতে পেরে তাদের অনেকেই দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ধর্মব্যবসায়ীরা দাঙ্গা সৃষ্টিতে পারঙ্গম থাকবে এ কথাটি রসুলাল্লাহ (স.) ১৪শ’ বছর আগেই বলে গেছেন। তিনি বলেছেন, “আখেরি যুগে আমার উম্মাহর আলেমরা হবে আসমানের নিচে নিকৃষ্টতম জীব। তাদের তৈরি ফেতনা তাদের দিকেই ধাবিত হবে।” (আলী রা. থেকে বায়হাকি, মেশকাত)। তবে যারা সত্যনিষ্ঠ আলেম তাদের কথা স্বতন্ত্র। এখানে তিনি ফেতনা সৃষ্টিকারী ধর্মব্যবসায়ী আলেমদের বিষয়েই বলেছেন। একজন অন্ধ যেমন অপর অন্ধকে পথ দেখাতে পারে না, একটি অন্যায় দিয়ে আরেকটি অন্যায় নির্মূল করা যায় না, তেমনি যারা নিজেরাই সমাজে ফেতনা সৃষ্টি করছে তাদের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের মতো ফেতনা দূর হওয়া সম্ভব নয়। এটা কেবলমাত্র সময়, অর্থ আর শ্রমের অপচয় ঘটাবে। উপরন্তু বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের চর্চা শুরুই হয়েছে এই শ্রেণিটির হাত ধরে এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে কি? যারা স্বার্থের কাঙ্গাল তাদের দ্বারা কখনো জঙ্গিবাদের মতো সাংঘাতিক বৈশ্বিক ও জাতীয় সমস্যা নির্মূল করা সম্ভব না।
২. জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় আমাদেরকে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। ১৯৪৭ সালের অবস্থা আর ১৯৭১ সালের অবস্থা এক ছিল না, আবার ১৯৭১ সালের অবস্থা আর ২০১৭ সালের অবস্থাও এক নয়। আবার ৫০০ বছর আগের পৃথিবীর সাথে বর্তমান পৃথিবীর কোনো মিলই নেই, সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বহু বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। মুসলিমদের মধ্যে যাদের একটু দৃষ্টিশক্তি আছে তারা দেখতে পাচ্ছে যে, বিশ্বময় শত শত বছর ধরে মুসলমানেরা মার খাচ্ছে। তারা আফ্রিকায় শত শত বছর থেকে না খেয়ে মরছে। মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বলছে অর্ধশত বছর ধরে। ফিলিস্তিনিরা মার খাচ্ছে, রোহিঙ্গারা মার খাচ্ছে, বসনিয়া-চেচনিয়া থেকে মুসলমান সম্প্রদায়কে নির্মূল করে ফেলা হয়েছে। এভাবে বিশ্বের বহু এলাকা থেকে তাদের উপর হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে উৎখাত করে দেওয়া হয়েছে। সাড়ে ছয় কোটি মুসলমান আজ উদ্বাস্তু। তাদের বহু সমৃদ্ধ শহর নগর দেশ বোমার আঘাতে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। একটি কথা আছে, অষষ ফবঢ়বহফ ড়হ পরৎপঁসংঃধহপবং. কাজেই এই পরিস্থিতি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যখন কেউ কথা বলবেন তখন মানুষ বিবেচনা করবে যে, লোকটির কথা কি মুসলিমদের উপর চলমান নির্যাতনের বিরুদ্ধে নাকি তিনি সাম্রাজ্যবাদীদের সুরে কথা বলছেন। জঙ্গিবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থরক্ষামূলক বক্তব্য মুসলমানদের কাছে গৃহীত হবে না।
৩. এ জনগোষ্ঠীর কাছে এমন একটি ঐশী গ্রন্থ আছে যা বিন্দুমাত্রও পরিবর্তিত হয় নি, হবেও না। এই গ্রন্থ সবার কাছে আছে। জঙ্গিবাদীরা কোর’আনের যে আয়াতগুলোর উদ্ধৃতি দিয়ে থাকে মানুষ সেগুলো কোর’আন খুলে যাচাই করে। যখন দেখে সেগুলো কোর’আনে আছে তখন তাদের কেউ কেউ জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যারা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে পাল্টা মতাদর্শ প্রচার করবেন তাদের কথাকেও মানুষ সেভাবেই কোর’আনের সাথে মিলিয়ে দেখবে। কোর’আনের সেই সমস্ত আয়াতগুলো যেখানে যুদ্ধ সংক্রান্ত নির্দেশ রয়েছে সেগুলোরও গ্রহণযোগ্য ও সঠিক ব্যাখ্যা তাদের দিতে হবে। যারা কেবল এটুকু বলেই খালাস যে ইসলাম শান্তির ধর্ম, একজন মানুষকে হত্যা করা মানে সব মানুষকে হত্যা করা, ইসলামে কেবল আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়েছে ইত্যাদি তাদের বারবার উচ্চারিত এই বক্তব্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না। কারণ বিষয়টি এত সরল নয়। রসুলাল্লাহর মদীনাজীবন কেটেছে যুদ্ধের ময়দানে, কোর’আনের অন্তত পাঁচ শতাধিক যুদ্ধ সংক্রান্ত আয়াত রয়েছে, রসুলাল্লাহ শত্রুদের আক্রমণ করেছেন, তাদের সাথে সন্ধি করেছেন, যুদ্ধে যা হয়ে থাকে ইত্যাদি সম্পর্কিত হাজার হাজার ঘটনা হাদিসগ্রন্থগুলোতে এসেছে। এ সত্য কারো অস্বীকার করার উপায় নেই। এগুলোর ব্যাখ্যা এখন দিতে হবে কারণ জঙ্গিবাদীরা এ বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। এগুলোকে এড়িয়ে জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করা যাবে না। এখানে আমাদের কথা হচ্ছে, রসুলাল্লাহ (স.) শুধু রসুল ছিলেন না, তিনি মদীনায় গঠিত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, সেনাবাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন, আদালতের বিচারক ছিলেন। কাজেই তিনি শুধু উপদেশ দেন নি, একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে জাতির সামগ্রিক কল্যাণে বহু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেমনটা অপরাপর রাষ্ট্রনায়কদের নিতে হয়। সেনাপ্রধান হিসাবে যুদ্ধের আয়োজন করেছেন, শত্রুকে বন্দি করেছেন, সন্ধি করেছেন। বিচারক হিসাবে তিনি ফায়সালা দিয়েছেন, অপরাধীদের দ- কার্যকর করেছেন। এখন বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্নভাবে কোর’আনের একটি আয়াত বা হাদিস উল্লেখ করে যারা বিভিন্ন ফতোয়া জারি করে মানুষ মেরে ফেলছে তারা যে এটা কোর’আন হাদিসে থাকলেও করতে পারেন না, এটা তাদেরকে কে বোঝাবে? ঐ ফতোয়া প্রদানকারীরা কি রসুলাল্লাহর মতো জাতির স্বীকৃতিক্রমে রাষ্ট্রনায়ক হয়েছে, বিচারক হয়েছে, সেনাপ্রধান হয়েছে যে ইসলামের ঐ পর্যায়ের সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করার নির্দেশদান করতে পারে? জাতি কি তাদেরকে এই অথরিটি দিয়েছে? মোটেই না। এখন এই ব্যাখ্যাগুলো তারাই দিতে পারবে যাদের ইসলাম সম্পর্কে সম্যক ধারণা, সামগ্রিক ধারণা রয়েছে, পূর্ণাঙ্গ আকিদা রয়েছে। যাদের কাছে ইসলামের প্রকৃত আকিদা নেই তারা কখনওই জেহাদ কেতাল আর সন্ত্রাসের সীমারেখা টানতে পারবে না। জঙ্গিবাদীরা যেটা করছে সেটা জেহাদ বা কেতাল নয়, সেটা সন্ত্রাস- এ বিষয়টি অকাট্যভাবে ইসলামের আলোকে প্রমাণ করতে হবে। আমাদের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আল্লাহ আমাদেরকে দয়া করে ইসলামের প্রকৃত আকিদা দান করেছেন। ইসলামের সামগ্রিক রূপটা কেমন সেটি আমরা ধর্মবিশ্বাসী মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি যাতে করে কেউ তাদের ঈমানকে ভুল খাতে প্রবাহিত করে মানবতাবিরোধী, জাতিবিনাশী কর্মকা- ঘটাতে না পারে।
আজ আপনাকে যে পত্র লিখছি তার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, আমরা দেখতে পাচ্ছি ধর্মের নামে বিভিন্ন ধরনের দল রয়েছে যাদের কেউ ধর্মের নামে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করছেন, কেউ ধর্মকে ব্যবহার করে বিপুল সম্পদের মালিক হচ্ছে, কেউ জঙ্গিবাদী কর্মকা- করে দেশে আতঙ্ক বিস্তার করছে এবং সাম্রাজ্যবাদীদের অস্ত্রব্যবসার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। এতে একদিকে মুসলমানদের দেশগুলো আক্রান্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বদনাম হচ্ছে ইসলামের। মুসলিমদেরকে সন্ত্রাসী বলে ঘৃণা করা হচ্ছে। যে মহাসংকটে পৃথিবী পড়েছে তার হাত থেকে আমাদের দেশকে রক্ষা করার জন্য পুরো জাতির সামগ্রিক কোনো উদ্যোগ নেই। সত্যিকারভাবে মুসলমান নামক জাতি আজ বিরাট সঙ্কটে পড়েছে। ভিতর থেকে যেমন, বাইরে থেকেও তেমন। কাজেই মামুলি কোনো উদ্যোগ দিয়ে এই সংকট থেকে বাঁচা সম্ভব হবে না। ষোল কোটি মানুষ যদি দেশপ্রেমের চেতনায় বা ঈমানী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এক ইস্পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ জাতিসত্তায় রূপান্তরিত হতে পারে যার মধ্যে কোনো একটি ফাটলও থাকবে না, তাহলেই সম্ভব হবে বৈশ্বিক সংকট থেকে, সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে দেশকে নিরাপদ রাখা। আমরা আপনার দলের বহু নেতাকর্মীকে, মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, সাংসদবর্গকে আমাদের অনুষ্ঠানগুলোতে আমন্ত্রণ জানিয়েছি যেন তারা কাছ থেকে আমাদেরকে দেখেন, আমাদের বক্তব্য শোনেন ও বিবেচনা করেন। আমরা সরকারের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন কর্র্র্র্মকর্তাকে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাকেও বোঝানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু তাদের কেউ কেউ পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হন না, উপরন্তু তারা আমাদের আন্দোলনের আরবি নাম “হেযবুত তওহীদ” দেখে অন্যান্য সংগঠনের সাথে গুলিয়ে ফেলেন বা একই পাল্লায় ফেলে দেন। আমরা কী বলছি, কী করছি তা বিবেচনা করার সময়ও তাদের হয় না। হেযবুত তওহীদের কোনো গোপন কর্মকা- নেই, আমাদের সব কাজ, সব ধারণা দিনের আলোর মত প্রকাশ্য। আমাদের সব কাজ জনগণকে নিয়ে, জনগণের জন্য। আমরা প্রমাণ দিয়েছি, জনগণের জন্য কাজ করতে গিয়ে ভাঙচুর, জ্বালাও পোড়াও, হরতাল, অবরোধ আরোপের প্রয়োজন হয় না। জনগণের সামনে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার পর জনগণই সিদ্ধান্ত নিবে যে তারা কোনটা গ্রহণ করবে। আমরা বিশ্বাস করি, মানুষের মনের উপর জোর চলে না, আদর্শিক কাজ জোর জবরদস্তি করে হয় না। যেমন একাত্তর সালে জনগণই দেশ স্বাধীন করেছিল। আমরা বিশ্বাস করি সেই জনগণকেই যদি একটি সঠিক আদর্শে অনুপ্রাণিত করা যায় তারাই দেশের সম্পদে পরিণত হবে, তারা দেশ রক্ষায় মানবতার কল্যাণে নিঃস্বার্থ ভূমিকা রাখবে। ষোল কোটি মানুষের জাতীয় ঐক্যের শক্তি বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি সমৃদ্ধ, সম্মানিত ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিত এনে দেবে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে দেশটাকে স্বাধীন করা হয়েছিল। কিন্তু বিশেষ করে দু’টি কারণে গত ৪৬ বছরে আমরা একদিনের জন্যও ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি নি। একটি হলো ধর্মের নামে নানা ফতোয়াবাজি। ধর্মের নামে বিভিন্ন দল গঠন করে, ফেরকাবাজি করে, অপরাজনীতি করে, বিভিন্ন সময় নানা গুজব আর হুজুগ ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা ও জাতিবিনাশী কর্মকা-ে লেলিয়ে দেওয়ার ঘটনা আমরা বারবার প্রত্যক্ষ করেছি। আর দ্বিতীয়টি হলো পাশ্চাত্যের অনুকরণে বিভাজন সৃষ্টিকারী রাজনীতি-চর্চা। এই চর্চা পুরো জাতিকে দলে দলে বিভক্ত করে একের বিরুদ্ধে অন্যকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অবস্থা এমন যে, জঙ্গিবাদের মতো একটি গুরুতর সংকট যা পুরো জাতির অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে, সেই সংকটকে মোকাবেলার সময়ও আমরা সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে এক কাতারে দাঁড়াতে দেখি না। বরং রাষ্ট্র আরো বেকায়দায় পড়ুক, প্রয়োজনে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র অকার্যকর হয়ে পড়ুক, এটাই যেন অনেকের কাম্য। অথচ এসব করেই আজকে ইরাক-সিরিয়া আমাদের চোখের সামনে গণকবরে পরিণত হয়েছে।
আগেই বলেছি, এখন পরিস্থিতি অনেক পাল্টে গেছে। এখন সময়ের প্রয়োজনে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা যেমন তুলে ধরতে হবে তেমনি ঔপনিবেশিক যুগের উত্তরাধিকার বিভাজনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন ঘটাতে হবে। পাশাপাশি আমাদের চলমান দ্বিমুখী বিভাজনমূলক শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। বিভেদ বিভক্তি আর অনৈক্যের সকল দেওয়াল ভেঙে ফেলতে হবে সেটা শিক্ষায় হোক, রাজনীতিতে হোক বা ধর্মেই হোক। এখন ঐক্য জরুরি। ঐক্য অনৈক্যের উপর বিজয় লাভ করবে এটা প্রাকৃতিক নিয়ম। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল এটা যেমন ইতিহাস তেমনি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব এখন আপনার এটা হলো বর্তমান। কাজেই ষোল কোটি মানুষকে একটি ইস্পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করার উদ্যোগ আপনি নিতে পারেন। আমরা পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, সেটার জন্য যে আদর্শ দরকার সেটা আমাদের কাছে রয়েছে।
এখানে প্রসঙ্গক্রমে বলতে চাই, আল্লাহর রসুল যে ইসলাম নিয়ে এসেছিলেন আর আজকে ইসলামের যে রূপটি আমরা দেখছি, এই দুইয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। সেই ইসলাম আরবের আইয়ামে জাহিলিয়াতের বর্বর, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, পারস্পরিক দাঙ্গা হাঙ্গামায় লিপ্ত জাতিটাকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, শত্রুকে ভাই বানিয়েছিল। স্বার্থপরকে নিঃস্বার্থ বানিয়েছিল। সেই ইসলামে জাতির মধ্যে এত মতভেদ, মাযহাব ছিল না, গোঁড়ামি, কূপম-ূকতা, অন্ধত্ব ছিল না, শিয়া-সুন্নি বলে কোনো কিছুর অস্তিত্বই ছিল না, পুরো জনগোষ্ঠী ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবে আর একটি গোষ্ঠী তাদের যাবতীয় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা করিয়ে টাকা রোজগার করবে এমন রীতি ছিল না। সেই ইসলাম মুসলিম জাতিটিকে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষায়, নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে, নিত্যনতুন প্রযুক্তিতে পৃথিবীর সকল জাতির শিক্ষকের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল। সেই ইসলামের অনুসারীদের আজ এই হীন দশা কেন?
প্রশ্ন আসতে পারে, আকাশের মত উদার, সমুদ্রের মতো বিশাল, চূড়ান্ত যৌক্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ, সকল শ্রেণির মানুষের জন্য প্রযোজ্য, প্রাকৃতিক নিয়মের সাথে সঙ্গতিশীল একটি জীবনব্যবস্থা ইসলাম তা কেমন করে বিকৃত হলো? সে এক দীর্ঘ ইতিহাস যা বলার জায়গা এটা নয়। ১৩০০ বছর ধরে ফকীহ, মোফাসসির, মোহাদ্দিসদের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের দ্বারাই দীনের মধ্যে এই বিকৃতি এসেছে, গুরুত্বের ওলট-পালট ঘটেছে। বিকৃতির চূড়ান্ত সীমানা অতিক্রম করল যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করল। তারা সেখানে তাদের পছন্দ মোতাবেক সিলেবাস তৈরি করে এমন একটি ইসলাম মুসলমানদেরকে শিক্ষা দিল যা শিখে তারা কোনোদিন ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে না, মানুষের কল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে অবদান রাখা তো দূরের কথা। মাদ্রাসা শিক্ষিত শ্রেণিটিকে কোনো কর্মমুখী শিক্ষাই দেওয়া হলো না যেন তারা ঐ ধর্মীয় শিক্ষাকেই পুঁজি করে জীবিকা নির্বাহ করতে বাধ্য হয়। আর এইভাবে ব্রিটিশদের শেখানো ইসলামটা এই জাতির মনে মগজে গেড়ে যায়। ১৪৬ বছর ইংরেজ প্রাচ্যবিদেরাই (যারা ধর্মের দিক থেকে খ্রিষ্টান) অধ্যক্ষপদে থেকে নিজেদের তত্ত্বাবধানে মাদ্রাসা পরিচালনা করল। আজও মোটামুটি সেই শিক্ষাব্যবস্থাই চলছে, সেই সিলেবাসই চলছে। আজও তারা জীবিকার জন্য ধর্মব্যবসার উপরই নির্ভরশীল। সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষা এই বিভাজনমূলক শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে সেই উপনিবেশ যুগ থেকেই জাতির মানসিকতাকে বিভক্ত করে রাখা হয়েছে, একে অপরের প্রতি বিদ্বেষী করে রাখা হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে এই অবস্থায় রেখে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না।
আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। এই মাটিতে আমাদের পূর্বপুরুষদের অস্থি-মজ্জা মিশে আছে। এই বাংলার আলো বাতাসে আমরা বড় হয়েছি, এই মাটির ফসল খেয়ে আমরা পুষ্ট হয়েছি। দেশের সংকট মুহূর্তে দেশ রক্ষার কাজে এগিয়ে আসাকে আমরা দায়িত্ব মনে করছি। আমরা অন্তত একটা কথা বুঝি, এ দেশ যদি আক্রান্ত হয়, তবে আমাদের দাঁড়ানোর জায়গা থাকবে না। আমরাও উদ্বাস্তু হবো। তখন আমাদের না থাকবে জাতি, না থাকবে ধর্ম। তাই জাতির এই সংকটকালে আমরা নির্বিকার থাকতে পারি নি। দেশ রক্ষার জন্য প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করাকে আমরা গৌরবের মনে করি, ইবাদত মনে করি। আমরা সর্বান্তকরণে চেষ্টা করে যাচ্ছি ষোল কোটি মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের চেতনা জাগিয়ে তুলতে, ঈমানী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে। কিন্তু যে কাজটি সরকার করতে পারে তা কি একটি আন্দোলনের পক্ষে সম্ভব হয়? হয় না। তাই বাংলাদেশের নাগরিকদের অভিভাবক হিসাবে, সরকারপ্রধান হিসাবে আপনার নিকট আমাদেরকে প্রস্তাবনা পেশ করতে হচ্ছে। আমরা পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে আবারও বলছি, আমাদের কাছে দেশ ও দেশের মানুষকে মহাসংকট থেকে মুক্তির পথ আছে। সেটা ইহকালেও, পরকালেও। এই সম্পদ হাতে নিয়ে আমরা বসে থাকতে পারি না। পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও সঙ্গীন। পরাশক্তিগুলি যুদ্ধ বাঁধানোর জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। সীমান্তে সীমান্তে তারা সৈন্যসমাবেশ করছে, অস্ত্রবাহী নৌবহর নিয়ে সমুদ্রমন্থন করছে। পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের প্রস্তুতি নিচ্ছে, মহড়া দিচ্ছে। সামরিক খাতে বাজেট বহুগুণ বৃদ্ধি করছে। সেখানে আমাদের এখনো দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে যেতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় পরাশক্তিগুলোর হাতে কোনো অসিলা তুলে দেওয়া হবে আমাদের জন্য আত্মহত্যার নামান্তর। কেননা ইসলামবিদ্বেষ হোক আর অস্ত্রব্যবসার প্রয়োজনে হোক, কোনো একটা অসিলা পেলেই স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের উপর হামলে পড়া তাদের মজ্জার সাথে মিশে আছে।
পরিশেষে আমাদের বক্তব্য এই যে, আমরা হেযবুত তওহীদ ইসলামের প্রকৃত আকিদা জনগণের সামনে তুলে ধরার মাধ্যমে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, সা¤্রাজ্যবাদসহ যাবতীয় হুমকি থেকে এ দেশের মাটিকে রক্ষা করতে নিজেদের সীমিত সক্ষমতার মধ্যে থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আগেই উল্লেখ করেছি, আমাদের এ কাজে আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও অযৌক্তিক হয়রানির শিকার হয়ে আসছি। দেশের প্রচলিত আইন মান্য করে জাতির কল্যাণার্থে হেযবুত তওহীদ যে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে, কেউ যেন তাতে কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে সে লক্ষ্যে আপনার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রত্যাশা করছি।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে এবং প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে হেফাজত করুন। আপনার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করছি।

বিনীত
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম
এমাম, হেযবুত তওহীদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.