‘শেষ দিনের কান্নায়’ ভেসে গেছে ব্যাপারীদের ঈদ আনন্দ

ভারত-মিয়ানমার থেকে পশু আসার অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

কাক্সিক্ষত দাম না পেয়ে ও পশু বিক্রি করতে না পেরে রাজধানীর কোরবানির হাটগুলোতে পশু ব্যবসায়ীরা অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। সোমবার (২০ আগস্ট) পর্যন্ত পশুর দাম যথেষ্ট ভালো পেলেও শেষ দিন মঙ্গলবার (২১ আগস্ট) সকাল থেকে পশুর দাম অর্ধেকে নেমে আসে। জীবিকার তাগিদে অনেকেই অপেক্ষাকৃত কম দামে পশু বিক্রি করে দিয়েছেন। আবার অনেক ব্যবসায়ী দাম না পাওয়ায় পশু বিক্রি করতে পারেননি। শেষ রাতে কম মূল্যে পশু বিক্রি করে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন অনেকেই।

মানিকগঞ্জের বাগুটিয়া চর কাটারিপাড়া থেকে ১৩ জন চরবাসী মিলে ২৬টি গরু নিয়ে রাজধানীর মেরাদিয়া হাটে এসেছিলেন ইউনুস আলী। সোমবার পর্যন্ত ৮টি গরু বিক্রি করতে পারলেও বাকি ১৮টি গরু বিক্রি করতে পারেননি তিনি। ইউনুস আলী বলেন, ‘গত সোমবার যে গরু ক্রেতারা ৬০ হাজার টাকা বলেছে, মঙ্গলবার সেই গরুর দাম বলেছে ২৫ হাজার টাকা। এই দামে গরু বিক্রি করলে লাভ তো দূরের কথা, অনেক টাকা লোকসান হবে।’ এই ব্যবসায়ী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার দুইটা ছেলে মেয়ে মাদ্রাসায় পড়ে। কিছু লাভের আসায় এতো দূর থেকে গরু নিয়ে ঢাকায় এসেছি। কিন্তু দু’টাকা নিয়ে যদি বাড়ি না ফিরি, তাহলে তারা ঈদের জামাতে যাবে না। বাড়ি ফিরবো কেমনে?’ বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কুষ্টিয়া থেকে ২২টি বড় বড় গরু নিয়ে হাটে এসেছিলেন তবিবুর রহমান। তিনি জানান, তার প্রতিটি গরুর দাম দুই লাখ টাকা করে। মানুষ গরুগুলো দেখতে আসে। কিন্তু দাম বলে সর্বোচ্চ ৮০ হাজার টাকা করে। এ কারণে তিনি একটা গরুও বিক্রি করতে পারেননি। পরে রাত ১০টার দিকে গরুগুলো ট্রাক ভর্তি করে আবারও গ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তিনি বলেন, ‘গ্রাম থেকে গরুগুলো আনতে প্রতিটির জন্য আড়াই হাজার টাকা করে মোট ৫৫ হাজার টাকা ট্রাক ভাড়া দিতে হয়েছে। এখন বাড়ি ফেরত নিতে প্রতিটি গরুর জন্য তিন হাজার টাকা করে দিতে হচ্ছে। সব টাকাই লস। বড় গরু হওয়ায় কেউ কিনতে চায় না। দামও বলে না।’ বলতে বলতে চোখের পানি মুছতে থাকেন তবিবুর।

শুধু মানিকগঞ্জের ইউনুস আলী কিংবা কুষ্টিয়ার তবিবুর রহমান নয়, তাদের মতো শত শত পশু ব্যবসায়ী কেঁদেছেন পশু বিক্রি করতে না পেরে, কেউবা ন্যায্য দাম না পেয়ে। সোমবার নাগরীর ২৫টি হাটের প্রায় সব ক’টিতেই এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, ভারত ও মিয়ানমার থেকে গরু আসার কারণে বাজারে দেশি গরুর দাম কমে গেছে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজধানীর কোরবানির পশুর হাটগুলোতে ছিল মন্দা। পর্যাপ্ত গরু দেখা গেলেও ক্রেতা ছিল কম। গত কয়েকদিন ধরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে দর-কষাকষির চিত্র দেখা গেলেও মঙ্গলবার তা আর ছিল না। ক্রেতারা যে দাম বলছিলেন তা শুনে মন খারাপ হয়ে যায় ব্যবসায়ীদের। তারা জানান, সোমবার থেকে ভারত ও মিয়ানমারের পশু আসতে শুরু করে। তারা ধারণা করেছিলেন এবার কোনও পশু আসবে না, সীমান্তে কড়াকড়ি থাকবে। যে কারণে গত বছরের মতো এবছরও শেষ মুহূর্তে পশুর সংকট দেখা দিতে পারে। তাই এত দিন বেশি দাম হাঁকিয়ে পশু ধরে রেখেছেন। কিন্তু সোমবার থেকে ভারত ও মিয়ানমারের পশু আসতে থাকায় মঙ্গলবার পশুর অনেকটাই দাম পড়ে যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর হাটগুলোতে শেষ সময়ে যারা এসেছিলেন, তারা কম দামে পশু পেয়ে ফিরছেন হাসিমুখে। আর কাক্সিক্ষত দাম না পেয়ে বিক্রেতাদের চোখেমুখে হতাশার ছাপ দেখা গেছে। সেগুনবাগিচার বাসিন্দা হাজী শাহ আলম বলেন, ‘রাতে গাবতলী হাট থেকে একলাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে একটা গরু কিনেছি। অনেক বড় গরু। মাংসও অনেক হবে। তুলনামূলক দামটা কমই হয়েছে।’ জানা গেছে, রাতে গাবতলীতে কোরবানির পশুর হাটে অনেক ব্যবসায়ীই দাম না পেয়ে শেষ রাত পর্যন্ত হাটে অপেক্ষা করেছেন, যারা ঈদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিন কোরবানি দেবেন তাদের জন্য।

ঈদের দিন সকালে আফতাব নগর হাটে দেখা গেছে, তখনও পশু নিয়ে বসে আছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের একজন দিনাজপুরের নাজিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি চারটা গরু নিজের খামারে লালন-পালন করে বিক্রির জন্য ঢাকায় এনেছি। কিন্তু যে দাম, এই দামে বিক্রি করলে পথে বসতে হবে। এখনও বিক্রি করতে পারিনি। গরুগুলো ঢাকায় আনতে খরচ হয়েছে। বাড়িতে ফেরত নেওয়ার কোনও টাকা নেই। সেজন্যই বসে আছি, দেখি বিক্রি হয় কিনা।

বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম গাবতলী হাটের চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘গাবতলী হাটে অনেক গরু। কিন্তু বিক্রি নেই। ব্যবসায়ীরা বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। এখন ট্রাকও পাচ্ছেন না। ভারত ও মিয়ানমার থেকে অনেক বেশি গরু আসায় এই অবস্থা।’ এই হাটের ইজারাদার মো. লুৎফুর রহমান বলেন, ‘এবার বাজারের অবস্থা খুবই খারাপ। প্রচুর পশু রয়ে গেছে। ভারতীয় গরুও অনেক। দেশি ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। পশুর পেছনে তাদের যে পরিমাণ ব্যয় হয়েছে, তা কিছুতেই পোষাতে পারছেন না। অনেক ব্যবসায়ী চিন্তায় পড়ে গেছেন। অনেকেই খরচ পোষাতে কম দামে বিক্রি করে দিয়েছেন।’ খিলক্ষেত বনরূপা আবাসিক প্রকল্পের খালি জায়গার হাটের ইজারাদার আনিছুর রহমান নাইম বলেন, ‘পশুর দাম অনেক কম। বিক্রেতারা কম দামেই বিক্রি করে দিয়েছেন। তারা হতাশ। দাম না পেয়ে অনেকেই কান্না করছে।’