Date: November 26, 2022

দৈনিক বজ্রশক্তি

Header
collapse
...
Home / বিশেষ নিবন্ধ / তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ: আত্মাহীন যান্ত্রিক প্রগতির পরিণাম

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ: আত্মাহীন যান্ত্রিক প্রগতির পরিণাম

November 24, 2022 08:11:41 AM   বিশেষ নিবন্ধ
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ: আত্মাহীন যান্ত্রিক প্রগতির পরিণাম

আদিবা ইসলাম:
আজ মানবজাতি যান্ত্রিক উন্নতি, প্রগতি, উৎকর্ষের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে তার অতীতের দিকে অনুকম্পার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে ভাবছে জ্ঞানে বিজ্ঞানে এত সফলতা, এত উন্নতি বুঝি মানবজাতি আর কখনো অর্জন করেনি। সে প্রযুক্তি ব্যবহার করে নদীর গতিপথ ঘুরিয়ে দিচ্ছে, আকাশের বিদ্যুৎকে সে চাকরের মতো বেঁধে কাজ করাচ্ছে, গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কয়েক মিনিটের মধ্যে সে পৃথিবীর এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে চলে যাচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মাইল দূরে থেকে সে যোগাযোগ স্থাপন করছে, সে গভীর সমুদ্রের তলদেশে টানেল বসিয়ে তৈরি করছে পর্যটন কেন্দ্র, শুষ্ক মরুভূমিতে করছে ফসল উৎপাদন।  সে সময়ের আগে আগে ছুটছে। তার আজকের উদ্ভাবন গতকালের রেকর্ডকে ভেঙে ফেলছে। যান্ত্রিক উন্নতির হিসাব যদি করি তাহলে তার নিত্য নতুন উদ্ভাবন প্রতিনিয়ত অনন্য বিস্ময় সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে এই আবিষ্কারই তাকে জীবন ধ্বংসকারী পারমাণবিক যুদ্ধের মুখোমুখী এনে দাঁড় করিয়েছে। শুধু দাঁড় করিয়েছে বললে ভুল হবে, মানুষের যান্ত্রিক উন্নতি, সফলতা মানুষকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে যে, তা এই পৃথিবী নামক গ্রহটাকেও ভেঙে ফেলতে পারে। এত বিপুল পরিমাণ পারমাণবিক-আণবিক বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র, রাসায়নিক মারণাস্ত্র, বোমা, অস্ত্র মানুষ জমা করেছে যে, এই বোমাগুলো যদি বিস্ফোরিত হতে শুরু করে তবে মানবজাতিসহ পৃথিবী নামক গ্রহটাই যে, ধ্বংস হয়ে যাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকেই এ কথা শুনে বলতে পারেন যে, এত বড় আত্মহত্যার কাজ মানুষ কখনো করবে না, কারণ এটা করলে সে নিজেও ধ্বংস হয়ে যাবে। এত কোটি কোটি মানুষের জীবনকে মূল্যহীন করে জীবন ধ্বংসকারী এসব পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ মানুষ ঘটাবে না। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, অধিকাংশ মানুষ যা চায় সবসময় তা হয় না, কারণ অধিকাংশ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে অল্প কিছু ক্ষমতাধর মানুষ আর তাদের কর্মফল সব মানুষকেই ভোগ করতে হয়। 
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কি মানবজাতি চেয়েছিল? চায়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ কেমন করে যুদ্ধ আরম্ভ হল তা লিখতে যেয়ে লেখেছেন-“ডব ধষষ ংষরঃযবৎবফ রহঃড় রঃ” অর্থাৎ আমরা কেমন যেন পিছলিয়ে ওর মধ্যে পড়ে গেলাম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে যদি পৃথিবীর মানুষের কাছে গণভোট নেওয়া হত যে, তারা যুদ্ধ চায় কি না? তবে সবগুলো ভোটই যুদ্ধের বিপক্ষে পড়ত এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবুও তো যুদ্ধ হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাত্র ২১ বছর পর আরও একটি মহাযুদ্ধ পৃথিবীর মানুষ প্রত্যেক্ষ করেছে, যে যুদ্ধের পরিণামে প্রায় ৭ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কয়েক দশক ধরে চলেছে পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্নায়ু যুদ্ধ বা ঠাণ্ডা লড়াই। ইংরেজিতে যাকে বলে ঈড়ষফ ডধৎ।   
স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইন্সটিটিউট সিপ্রি-র তথ্য অনুসারে গত কয়েক দশকে বিশ্বের ৯ টি পরাশক্তিধর দেশের কাছে ১৬,৩০০ পারমাণবিক বোমা জমা হয়েছে। যার একটি বোমা বিস্ফোরণের কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে এক একটি দেশ প্রায় ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তারা এখনও যে এসব বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়নি, শত্রুর দিকে তাঁক করে রাখা ট্রিগার চাপেনি তার একটাই কারণ, তা হল ভয়, যে শত্রুর সঙ্গে সে নিজেও যাবে। যুক্তরাষ্ট্র জানে সে যদি তার শত্রু রাশিয়াকে ধ্বংস করতে চায় তবে যতক্ষণে তার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র (ও.ঈ.ই.গ.) রাশিয়াতে পৌঁছে রাশিয়ার নর নারী শিশুদের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে, ততক্ষণে রাশিয়ার ক্ষেপনাস্ত্রও আমেরিকার দিকে অর্ধেক রাস্তা পার হয়ে আসবে এবং আমেরিকারও ঠিক সেই দশাই ঘটবে। রাশিয়াও জানে, সে যদি আমেরিকাকে ধ্বংস করতে চায় তবে তারও ঠিক তেমনি দশাই হবে। 
মানবতা নয়, দয়া নয়, ন্যায়ের প্রতি সম্মান নয়, অন্যায়ের প্রতি বিরূপতা নয়, কত কোটি মানুষ, শিশু পশু নিহত হবে, এ অনুভূতিও নয়- শুধু ভয়, শত্রুকে মারলে আমিও মরব, নিজের পরিণামের এই ভয়ই শুধু পৃথিবী ধ্বংসকারী অস্ত্রগুলোকে ব্যবহার থেকে মানুষকে বিরত রেখেছে। মানবতা ও ন্যায়ের খাতিরে যে এই হত্যাযজ্ঞ থেকে এরা বিরত নয় তার প্রমাণ নাগাসাকি ও হিরোশিমা। যান্ত্রিক ‘সভ্য’ ভাষায় এরই নাম (উবঃবৎৎবহঃ), দা’তাত। যে মুর্হূতে রাশিয়া বা আমেরিকা নিশ্চিত ভাবে বুঝবে, যে যান্ত্রিক প্রগতিতে আমরা এতদূর এগিয়েছি, এমন অস্ত্র তৈরি করতে পেরেছি যে, শত্রুর আঘাত আমি সম্পূর্ণভাবে ঠেকাতে পারব এবং আমার আঘাতকে সে ঠেকাতে পারবে না সে মুহূর্তে সে শত্রুকে আঘাত হানবে। কোন ন্যায়-অন্যায় বোধ, কোন দয়া-মায়া-মমতা তাদেরকে এতটুকু দেরি করাতে পারবে না।
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ যখন শুরু হল, তখনও কিন্তু আমরা ভাবিনি, করোনা মহামারীর পর আবারও এমন দীর্ঘমেয়াদী একটি যুদ্ধ পৃথিবীবাসীকে দেখতে হবে। ইউক্রেন থেকে যে, হাজার হাজার নাগরিক এখন উদ্বাস্তু হয়ে, শরণার্থী হয়ে ভিনদেশে পাড়ি জমাচ্ছে তারাও কিন্তু ভাবেনি যে, তাদের নিজেদের দেশ ছেড়ে তাদের এভাবে চলে যেতে হবে, এভাবে তাদের দেশ, বাড়িঘর বোমার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হবে, চোখের সামনে প্রিয়জন বোমার আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হবে। কিন্তু হয়েছে তো। যত দিন যাচ্ছে যুদ্ধের পরিস্থিতি আরো জটিল দিকে মোড় নিচ্ছে। প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন মারণাস্ত্রের প্রয়োগ হচ্ছে। ভ্যাকুয়াম ডার্টি বোম ব্যবহারের কথাও গণমাধ্যমে শোনা যাচ্ছে। গোড়া থেকেই রাসায়নিক বোমা ব্যবহারের হুমকি দিয়ে আসছে রাশিয়া। অন্যান্য পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোও দীর্ঘমেয়াদী একটি যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করেছে। গত বছর ২৪ ডিসেম্বর ইরান মহড়ার চতুর্থ ও শেষ দিনে একই সঙ্গে ১৬ টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। আর ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধটি শুরু হওয়ার পরপরই মার্চের মাঝামাঝি সময়ে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটি সফল পরীক্ষা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেই থেকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী অধিকাংশ দেশই দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার অশুভ প্রদর্শনীতে নেমেছে। সম্প্রতি (১৫ অক্টোবর ২০২২) একটি পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে আমাদের নিকটবর্তী বঙ্গোপসাগরে সফল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। একই মাসে যৌথভাবে সামরিক মহড়া চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া। তাদের যৌথ মহড়ার জবাব দিতে উত্তর কোরিয়া সম্প্রতি একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালাচ্ছে যা কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। দু সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে দেশটি ষষ্ঠ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে।
তাদের পারমাণবিক মহড়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে আঁচ করা যায় যে, সামনের দিনগুলোতে পৃথিবীবাসীকে হয়ত আরও একটি বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করতে হতে পারে। আর এবার যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় তার ভয়াবহতা অতীতের সকল ধ্বংসযজ্ঞকে ছাড়িয়ে যাবে তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। এই সভ্যতার উন্নতি, প্রগতি মানুষকে যান্ত্রিকভাবে উন্নত করেছে কিন্তু তাকে আত্মিকভাবে নিয়ে গেছে অন্ধকারের অতল গহ্বরে। মানুষ আজ দিশেহারা। বাহিরে সে যতই বস্তুগত চোখ ধাঁধানো উন্নতি দেখে বুক ফুলিয়ে বড়াই করুক ভেতরটা তার অন্তঃসারশূন্য। ভেতরে ভেতরে সে দেউলিয়া। এত যে যান্ত্রিক উন্নতি, এত যে নিত্য নতুন বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন কিছুই মানুষকে শান্তি দিতে পারেনি। হয়ত আরাম আয়েশ বৃদ্ধি করেছে, তার কাজের গতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু তার মানবিক কোমল বৃত্তির বিকাশ ঘটাতে পারেনি। একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ দিতে পারেনি যেখানে সে থাকবে ন্যায়, সুবিচার, নিরাপত্তায়। বরং সে যত উন্নত হয়েছে ততই সকল প্রকার অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে, অপরাধের নিত্য নতুন কৌশল আবিষ্কৃত হয়েছে, ততই মানুষ নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত, আত্মাহীন, জড়বস্তু হয়ে গিয়েছে। এই বস্তুবাদী একপেশে যান্ত্রিক প্রগতি সর্বশেষ আজ তাকে এনে দাঁড় করিয়েছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু এখন আর এই পথ থেকে ফেরার উপায় মানুষের জানা নেই। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ থামানো না গেলে তার এই  যান্ত্রিক প্রগতির সকল অহঙ্কারের কবর হবে এখানেই।