সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টিতে দায় কার?

আধুনিক যোগাযোগ ও প্রযুক্তির যুগে পৃথিবী একটা গ্রামে পরিণত হয়েছে। এ জন্য বিশ্বকে বলা হয় গ্লোবাল ভিলেজ। মুহূর্তেই পৃথিবীর ঐ প্রান্তে কি হচ্ছে তা জেনে যাচ্ছে পুরো বিশ্ববাসী। আর তা কেবল জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। অর্থনীতি, রাজনীতিসহ সামাজিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব সমানভাবে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে পৃথিবীতে যে সংবাদগুলো ছড়াচ্ছে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হচ্ছে মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে যুদ্ধের খবর, ইউরোপ-আমেরিকা জুড়ে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের খবর। সিরিয়ায়, ইরাকে, ইয়েমেনে চলছে ভয়াবহ যুদ্ধ। আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলা পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে এখনও সেখানে যুদ্ধ চলমান আছে। ষাট বছরের বেশি সময় ধরে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত পাকিস্তানের দ্বৈরথ চলছে। ফিলিস্তিনে চলছে ইসরাইলী আগ্রাসন। চীনের উইঘরে মুসলিমরা কোনঠাসা। মিয়ানমার আশির দশক থেকে মুসলিম রোহিঙ্গাদেরকে বিতাড়িত করে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ফ্রি থিংকের নামে ইসলাম ও আল্লাহ-রসুলকে নিয়ে চলছে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ।
আগ্রাসী সা¤্রাজ্যবাদী পরাশক্তিগুলো অস্ত্রের জোরে একটার পর একটা মুসলিম দেশ ধ্বংস করে দিচ্ছে। এসব নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক হতাশা ও ক্ষোভ। তরুণদের একটা অংশ বিশাল শক্তির বিরুদ্ধে লুকোছাপা করে কিছু একটা করার চেষ্টা করছে। তাতে ক্ষতি বৈ লাভ হচ্ছে না মোটেও। এদের কাজকে সন্ত্রাসী কাজ হিসেবে তুলে ধরে ইসলামকে উগ্রবাদী, অসহিঞ্চু ধর্ম হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সর্বত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। তবুও আবেগ থেকে, ধর্র্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকেই তাদের কাজকে সমর্থন করেন। অন্তত প্রকাশ্যে না হলেও মনে মনে তাদেরকে সাধুবাদ জানান। ফলে নতুন নতুন করে তরুণদের সংখ্যা বাড়ছে যারা এ ধরনের কাজ করে।
পাশ্চাত্যের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইসলামের অনুসারীদের একটা অংশ সরাসরি যুদ্ধে নেমেছে। তারা এটা তাদের ঈমানী কর্তব্য থেকেই করে যাচ্ছে বলে মনে করে। তবে তরুণদের আবেগকে পুঁজি করে একশ্রেণির ধার্মিকগণ শুধু পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধেই নয়, নিজ নিজ দেশের ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধেও তাদেরকে শক্তিকে ব্যবহার করছে। ফলশ্রুতিতে প্রায়শই বিভিন্ন দেশে নৃশংস ঘটনা ঘটছে। ধর্মীয় উগ্রতায় সৃষ্ট এসব সন্ত্রাসের পেছনে ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যাকারীদের যেমন ভূমিকা রয়েছে তেমনি পাশ্চাত্যের সা¤্রাজ্যবাদী দেশগুলোর ভূমিকা নেই? হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। সন্ত্রাসবাদের সূচনাটা মূলত তারাই করেছে। আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নকর্তৃক আফগানিস্তান দখল হয়ে যাওয়ার পর প্রতিদ্বন্দ্বী অপর পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র দখলদারদেরকে ঠেকাতে বিশ্বের মুসলিম যুবকদেরকে প্ররোচিত করে আফগানিস্তানে নিয়ে যায়। সে সময় অর্থ, অস্ত্র ও গোয়েন্দা সাহায্য দিয়ে তাদেরকে শক্তিশালী করা হয়। শুধু তাই নয়, মুসলমানদেরকে কাছে এ ধরনের যোদ্ধাদেরকে ইসলামিক যোদ্ধা বা মুজাহিদ বলে ইতিবাচক হিসেবে পরিচিত করে তোলা হয়। যতদিন এরা সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়েছে ততদিন তারা ভালোই ছিলো। কিন্তু পরে যখন সেই তারাই অস্ত্রের জোড়ে তালেবান নাম নিয়ে আফগানিস্তান দখল করে নেয় তখন তারাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়ালো। যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে অন্যতম যোদ্ধা সৌদি ভিন্নমতাবলম্বী ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেওয়ার অজুহাতে আফগানিস্তানে হামলা করে গুড়িয়ে দিলো। ভয়ানক মারণঘাতী অস্ত্রের মজুদ আছে এই অজুহাতে ইঙ্গ-মার্কিন ও অন্যান্য শক্তি ইরাকে হামলা করে দেশটিকে ধ্বংস করে দিলো। সিরিয়ায় বিদ্রোহী শক্তির হাতে অস্ত্র দিয়ে দেশটিকে অস্থিতিশীল করে তোলা হলো।
সেসব দেশের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে শুধু মুসলিমদের প্রাণ কেন, মানুষ মাত্রই বিচলিত হয়েছে। নারী ও শিশুদের যে পরিণতি হয়েছে তা দেখে প্রাণ কেঁদেছে। সেখানকার মানুষের বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়া যেখানে সমান বিষয় তখন অস্ত্রহাতে লড়াই করাই তাদের কাছে উত্তম মনে হয়েছে। এই অবস্থার স্রষ্টা কারা? সা¤্রাজ্যবাদী দেশগুলো এ ধরনের আগ্রাসী যুদ্ধ চাপিয়ে না দিলে তরুণদের যুদ্ধে নামার প্রয়োজন হতো কি? পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য তরুণদেরকে বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে বিপথে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ হতো কি?
পৃথিবীকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ দ্বারা অস্থিতিশীল করে তোলার জন্য এসব সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি এবং ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যাকারীরা সম্মিলিতভাবে দায়ী। পৃথিবী থেকে ঐসব দেশের আগ্রাসী নীতি যতদিন না থামানো যাবে ততদিন শান্তি আশা করা বৃথা। মানবজাতির বর্তমান পরিস্থিতির জন্য গোড়া চিহ্নিত না করে ভিন্ন উপায় অবলম্বন করা আর প্রবল স্রোতকে বালির বাঁধ দিয়ে ঠেকানো একই কথা।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.