সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর

নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

0

তপন কুমার রায়, বেরোবি প্রতিনিধি, রংপুর:
নানাবিধ সমস্যায় নিমজ্জিত রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। হাটি হাটি পা-পা করে প্রায় ৭ম বছরে এই নবীন উচ্চ বিদ্যাপিঠটি আজ নানাবিধ সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাচ্ছে না। বিশেষ এক সূত্র থেকে জানা যায়, বিবিধ সমস্যার ফলে একে অপরের দায়ভার আর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক এমনকি বর্তমান উপাচার্যকেও।
নবীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুঃখের কথা শোনার যেন কেউ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস চালু হওয়ার ৪র্থ বছরেও শিক্ষার্থীদের জন্য নেই নিয়মিত পানি ও পয়ঃনিষ্কাষণের সুব্যবস্থা। বিশেষ করে একাডেমিক ভবন ৩-এর সমস্যা আরও প্রকট। মৌখিক ও লিখিতভাবে বারবার অভিযোগ করেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের এ প্রচেষ্টা আজ ব্যর্থ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যেন নজরেই আসছে না শিক্ষার্থীদের এই সমস্যাটি। পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাষণের সুব্যবস্থার জন্য ২০১৩ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, শিক্ষার্থীদের অভিযোগে শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধানের মাধ্যমে লিখিত ও মৌখিকভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ, এমনকি শিক্ষকদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে শিক্ষার্থীরা সরাসরি কর্তৃপক্ষের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে দেখা করেও কোন স্থায়ী ফলাফল আসেনি। অভিযোগ করার পর সাময়িকভাবে পানি ও বাথরুম পরিষ্কার থাকলেও কয়েকদিন পর আবার সেই নোংরা অস্বাস্থ্যকর পানিবিহীন টয়লেট দেখতে পায় শিক্ষার্থীরা। তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মনোয়ার হোসেন বলেন, “শিক্ষকদের কথায় কাজ না হওয়ায় তারা বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রকৌশলী মো: জাহাঙ্গীর আলমের সাথে দেখা করে তাদের সমস্যার কথাগুলো বলেন। তিনি আমাদের আশ্বাস দেন। পরবর্তীতে বেশ কয়েকদিন টয়লেটে পানি থাকলেও এখন আবার সেই্ সমস্যা। এ ব্যাপারে নির্বাহী প্রকৌশলী মো: জাহাঙ্গীর আলম বলেন, টয়লেটে পানি সরবরাহের সমস্যাটি সমাধান করা হয়েছে। পানির সাপ্লাই লাইন থেকে সবকিছু ঠিক আছে। শুধু পাম্পের সুইচটি অন করলেই পানি পাওয়া যায়। আমাদের লোকবল কম হওয়ায় প্রত্যেকটি ভবনের নিরাপত্তা কর্র্মীদের এ ব্যাপারে পাম্প অন করার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু তারা আমাদের ইমেজ নষ্ট করার জন্য এই ছোট্ট কাজটিও করছে না।
নবীন এই বিশ্বদ্যিালয়টি যেন চোরদের আড্ডাখানাতে পরিণত হয়েছে। ফলে লেগেই আছে একের পর এক চুরি। অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীরাই এর সাথে জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র থেকে জানা যায়, গত রমজানের ঈদের ছুটিতে প্রশাসনিক ভবনের নিচ তলা থেকে তিন কর্মচারী বিদ্যুতের তার চুরি করার সময় হাতে নাতে নিরাপত্তা কর্মীদের কাছে ধরা পড়ে। এছাড়াও এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টোর রুম থেকে ১৬টি ফ্যান, মার্কেটিং বিভাগের ক্লাসরুম থেকে ২টি ফ্যান, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ল্যাব থেকে কম্পিউটার এবং ব্যবসা অনুষদের ডিন মো. ফেরদৌস রহমানের ব্যক্তিগত ল্যাপটপ চুরিসহ বেশ কয়েকটি চুরির ঘটনা ঘটে। এরকম অহরহ চুরির কারণে সম্মান এবং ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে। সংঘটিত চুরিসমূহের তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কোনটিই সুষ্ঠুভাবে আশার আলো দেখতে পারেনি। সাম্প্রতিক কালে চুরির ব্যাপারে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম চুরির তদন্ত চলছে বলে জানান।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. নাজমুল হক বলেন, “চুরিগুলো মূলত বিশ্বদ্যিালয়ের ছুটির সময় সংঘটিত হচ্ছে। সে সময় ক্যাম্পাস ফাঁকা থাকে। তাছাড়া নিরাপত্তাকর্মীদের ইন্টারভালের সমস্যার কারণেও এ ধরনের চুরি সংঘটিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে যেন এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে জন্য আমরা নিরাপত্তার ব্যাপারটি গুরত্বসহকারে দেখছি।
এদিকে বিশ্বদ্যিালয়ে চুরি ও দায়দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে নিরাপত্তা শাখার প্রধান কর্মকর্তা মো. মোক্তারুল ইসলাম বলেন, “যদিও দায় দায়িত্ব পুরাপুরি নিরাপত্তা শাখার কিন্তু আমাদের মধ্যে কর্মঠ ব্যক্তির অভাবের কারণেই এসব ঘটছে। এজন্য আমরা এই সেক্টরটিকে ডেভেলপ করার জন্য যথেষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। তিনি আরও জানান, আমাদের কিছু নিরাপত্তার অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে আমরা নিরাপত্তা শাখাকে জোরালো করতে পারছি না। যেমন, আমাদের গার্ডদের আলাদা পোশাক কিংবা নিরাপত্তার যাবতীয় সামগ্রীর অভাব রয়েছে। এছাড়াও মেইন গেটগুলো এখনো পুরোপুরি নির্মাণ করা হয়নি। তাই আশা করছি অতি জরুরি এসব সমস্যার সমাধান হবে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ৭ম বছরে এবং হলের ফলক উন্মোচনের চার বছরেও ছাত্রদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল চালু করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ২০১১ সালের ১৭ই মার্চ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. আব্দুল জলিল মিয়ার সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনীতি বিষয়ক তৎকালীন উপদেষ্টা প্রফেসর ড. আলাউদ্দীন আহমেদ । যার টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল ৬ই এপ্রিল ২০১০ সালে। ১৮ মাসের মধ্যে হলটি বসবাসের উপযোগী করার কথা ছিল। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম ও ২য় ব্যাচের øাতক শেষ হওয়ার পরেও ছাত্রদের আকাক্সিক্ষত হল চালু না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা আর অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ব্যক্তিগত মালিকানার মেসগুলোতে অসহনীয় জীবন কাটাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। একদিকে যেমন মেসগুলোতে থাকতে হচ্ছে চড়া দামে অন্যদিকে লেখাপড়ার উপযুক্ত পরিবেশ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. রাসেল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা প্রায় শেষ, অথচ এখনো হলে উঠতে পারলাম না। পারব কিনা তারও কোন নিশ্চয়তা নেই।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র থেকে জানা যায়, ছাত্রদের জন্য ২টি হলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তন্মধ্যে শহীদ মুক্তার এলাহী হল এখনও নির্মানাধীন রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল পূর্ণাঙ্গভাবে বসবাসের উপযোগী অনেক দিন আগেই হয়েছিল। অথচ কি কারণে হল চালু করা হচ্ছে না বিষয়টি সবার কাছে রহস্যজনক ও অজানা। হল দ্রুত চালু করতে বেশ কয়েকবার ছাত্র আন্দোলনও সংঘটিত হয়েছে। এদিকে ছাত্রশূন্য হলের দায়িত্বরত এক প্রভোস্ট গেলে স্থলাভিষিক্ত হন আরেক প্রভোস্ট। ছাত্রশূন্য হলের প্রভোস্টের কাজই বা কি এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় অনেককেই। জানা যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের বর্তমান প্রভোস্টের দায়িত্ব পালন করছেন ড. মো. মোরশেদ হোসেন। এর আগে তার জায়গায় ছিলেন ড. আ. কালাম মো. ফরিদ-উল ইসলাম।
হলের ব্যাপারে দায়িত্বরত প্রভোস্ট ড. মো. মোরশেদ হোসেনকে জিজ্ঞেস করলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

Leave A Reply