সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর

‘পেঁয়াজ পরিস্থিতি’ নিয়ন্ত্রণে এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি

ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি না করার সিদ্ধান্ত নেয়ার একদিন পর থেকেই বাংলাদেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছে। কেজি প্রতি ৮০ টাকায় যে পেঁয়াজ দুইদিন আগেও ঢাকার বাজারে বিক্রি হয়েছে, গতকাল তা অনেক বাজারে ১২০ টাকায়ও বিক্রি হয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের দাম গত এক মাসে দ্বিগুণ হয়েছে। এ বছর বর্ষায় অনিয়মিত ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট বিরূপ আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশ ও ভারতে পেঁয়াজের উৎপাদন ব্যহত হয়েছে। যার ফলে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
পেঁয়াজের ক্ষেত্রে যে একটি সঙ্কট তৈরি হতে যাচ্ছে সেটি মোটামুটি স্পষ্ট হয়েছিল বেশ কয়েক সপ্তাহ আগেই, যখন ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে আগের তুলনায় বেশ উঁচুতে ন্যূনতম মূল্য বেঁধে দিয়েছিল। বলা যেতে পারে সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল বাংলাদেশে পেঁয়াজ সরবরাহ পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। আর সে কারণেই সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে যে, পেঁয়াজের সঙ্কট কাটাতে সরকার কি যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পেরেছে? এই প্রশ্নের উত্তর যা-ই হোক না কেন, এ নিত্যপণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে এব্যাপারে আশু পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকেই।
বাজার বিশ্লেষকরা অবশ্য শুধুমাত্র ভারতের পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হওয়াকেই এর জন্য দায়ি করছেন না। তারা বলছেন, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির বিষয়টি বাদ দিলেও বাংলাদেশেই বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। তাহলে ভারতে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি কিংবা ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হওয়ার ফলে দেশীয় বাজারে পেঁয়াজের এরূপ অভুতপূর্ব মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি একটি অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই দেখছেন বাজার বিশ্লেষকরা। অনেকেই বলছেন, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হওয়ার ফায়দা লুটছে এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী অতিরিক্ত মুনাফালোভী ব্যবসায়ী। ভারতীয় পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির ডামাডোলে স্থানীয় পেঁয়াজ নিয়ে ব্যবসায়ীদের কারসাজির বিষয়টি এখানে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে এফবিসিসিআই, ঢাকা চেম্বার, মেট্রো চেম্বারসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে।
এছাড়াও ভবিষ্যতে এধরণের নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির মতো বিপর্যয় যেন না ঘটে সে লক্ষ্যে নিতে হবে সদূরপ্রসারী পদক্ষেপ। মনোযোগ দিতে হবে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে; আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে। পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সংরক্ষণ ও মজুদকরণের জন্য গড়ে তুলতে হবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত ব্যবস্থা। সেই সাথে অতিরিক্ত মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির নানা কারণের মধ্যে অন্যতম হলো- দুর্বল বাজার মনিটরিং, অসাধু আমদানিকারক, উৎপাদক, পরিবেশক, সরবরাহকারী, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী, অকার্যকর টিসিবি, সর্বোপরি ট্যারিফ কমিশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রাজস্ব বোর্ডের মধ্যে সমন্বয়হীনতা। যে কারণে ভোক্তা ও ক্রেতাস্বার্থ অধিকার এবং সংরক্ষণ বরাবরই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। সিন্ডিকেট তথা মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী চক্রের বাজার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও মুনাফা লুটে নেয়ার কথাও প্রায়ই উচ্চারিত হয়।
ব্যবসা-বাণিজ্যে লাভ-ক্ষতি-মুনাফা ইত্যাদি থাকবেই। তবে এসব হতে হবে নীতি-নৈতিকতা, সততা ও নিয়মকানুনের আওতায়, যেখানে আমাদের ঘাটতি রয়েছে বহুলাংশে। তাই এক্ষেত্রে প্রয়োজন সরকার তথা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিং ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনোভাব নিয়ে অগ্রসর হওয়া।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.