সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর

প্রকৃত আলেম কখনও ধর্মজীবী হতে পারেন না

রিয়াদুল হাসান:
ব্রিটিশরা মাদ্রাসা বসিয়ে আমাদেরকে ১৪৬ বছর দীন শিক্ষা দিয়েছে, আমরা শিখেছি। মনে করেছি, ব্রিটিশরা কত ভালো, তারা ইসলামের কত খেদমত করছে। তাদের তৈরি করা শিক্ষাব্যবস্থার ফসল যে ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী, আমরা শত শত বছর ধরে তাদের থেকে দীন শিক্ষা করছি। অথচ আল্লাহর রসুল বলেছেন, “তোমরা কীরূপ লোক থেকে তোমাদের দীন গ্রহণ করছো তা ভালোভাবে লক্ষ্য কোরো।” (হাদিস: মুসলিম, তিরমিযী, মেশকাত, শরহে নববী, মায়ারেফুস সুনান, মেরকাত, লুমাত, আশয়াতুল লুমাত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ ছবীহ, মোজাহেরে হক্ব।)

আলেম দুই প্রকার, সত্যনিষ্ঠ আলেম ও স্বার্থান্বেষী আলেম। তাই কারো কাছ থেকে দীনের জ্ঞান গ্রহণ করার আগে আমাদেরকে দুটো জিনিস বিবেচনা করতে হবে, প্রথমত সে এর দ্বারা কোনো বৈষয়িক স্বার্থ গ্রহণ করে কিনা। দ্বিতীয়ত, সে সত্যের উপর দৃঢ়পদ কিনা। স্বার্থ মিশ্রিত হলে যে কোনো জ্ঞানই বিষাক্ত হয়ে যায়, ঐ জ্ঞান আর মানুষের কল্যাণে আসে না, উল্টো মানুষের ক্ষতিসাধন করে। এ বিষয়ে আমীরুল মু’মিনীন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ও কা’ব ইবনুল আহবার (রা.) এর কথোপকথনটি খুবই শিক্ষণীয়।

ওমর (রা.) একদিন কা’ব (রা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, “আলেম বা ইলমের অধিকারী কে?” তিনি উত্তরে বললেন, “যারা ইলম অনুযায়ী আমল করে।” ওমর (রা.) পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “কোন জিনিস আলেমদের অন্তর থেকে ইলমকে দূর করে দেয়?” তিনি উত্তরে বললেন, “লোভ অর্থাৎ দুনিয়ার সম্পদ, সম্মান ইত্যাদি হাসিলের আকাক্সক্ষা।” (হাদিস: দায়েমী, মেশকাত, মেরকাত, লুময়াত, আশায়াতুল লুময়াত, শরহুত্ত্বীবী, তা’লীকুছ ছবীহ, মোজাহেরে হক্ব, মিরআতুল মানাজীহ্)
সুতরাং নিজেদের অর্জিত মাসলা-মাসায়েলের জ্ঞানকে পুঁজি করে যারা ধর্মব্যবসায় লিপ্ত হন তারা আর আলেম থাকেন না, দুনিয়ার সম্পদ, সম্মান ইত্যাদি হাসিলের আকাক্সক্ষা তাদের অন্তর থেকে জ্ঞানকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে, সেই জ্ঞান এখন কেবল পণ্য যা দিয়ে সে নিজেই উপকৃত হচ্ছে, যদিও সত্যিকার অর্থে সেটা উপকার নয় বরং এর দ্বারা সে নিজের পরকালকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তারা মানুষকে অন্ধভাবে ধর্মের বিধান মানতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে, তারা মানুষকে নির্বোধ বানিয়ে রাখতে চায়। এভাবে ধর্মবিশ্বাস যখন অন্ধবিশ্বাসে পরিণত হয় তখন খোদ ধর্মই বিষে পরিণত হয়। যে-ই অন্ধের মতো সে ধর্ম পালন করবে সে-ই ধর্মের নামে গোড়ামিপূর্ণ আজগুবি ধ্যানধারণা আর চিন্তাহীন, বুদ্ধিহীন আচরণের চর্চাকারী হয়ে যাবে। খাদ্য থেকে পুষ্টির উপাদান পরিপাকের মাধ্যমে নিংড়িয়ে নিলে সেই খাদ্য বর্জ্যে পরিণত হয়, তেমনি ধর্ম থেকে ধর্মব্যবসার মাধ্যমে এর প্রাণকে নিংড়িয়ে বের করে নেওয়া হয়েছে, ফলে বর্তমানে প্রতিটি ধর্মই বিষে পরিণত হয়েছে। খাদ্য হিসাবে মানুষকে সেই বিষাক্ত বর্জ্যই গেলানো হচ্ছে। এ কারণেই ধর্ম থেকে জন্ম নিচ্ছে জঙ্গিবাদ, ফতোয়াবাজি, সাম্প্রদায়িকতা, হুজুগে উন্মাদনা, ধর্ম নিয়ে অপরাজনীতি ইত্যাদি বহুবিধ ক্ষতিকারক রোগজীবাণু, প্যারাসাইট।

যারা সত্যিকার আলেম তারা কখনই নিজেদেরকে ‘আলেম’ বা জ্ঞানী বলে মনে করবেন না। প্রকৃত আলেম হচ্ছেন মহান আল্লাহ। তাঁর একটি নামই হচ্ছে ‘আলেম’। আল্লাহর সৃষ্টি এবং আল্লাহর দীন সম্পর্কে যারা জ্ঞান অর্জন করবেন তারাও এক প্রকার আলেম বা জ্ঞানী। যদিও বর্তমানে কেবল ধর্মীয় মাসলা-মাসায়েলের জ্ঞানের অধিকারীদেরকেই আলেম বলা হয়, যে ধারণা নিতান্তই মূঢ়তাসুলভ। আসুন দেখা যাক আল্লাহ স্বয়ং ‘জ্ঞান’ বলতে কি বুঝে থাকেন।
মুসা (আ.) একবার আল্লাহকে সাতটি প্রশ্ন করেছিলেন। তার মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল- আল্লাহ! আপনার বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানী কে? আল্লাহ বললেন- যে জ্ঞানার্জনে কখনো তৃপ্ত হয় না এবং মানুষের অর্জিত জ্ঞানকেও যে ব্যক্তি নিজের জ্ঞানের মধ্যে জমা করতে থাকে। (হাদিসে কুদসি- আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বায়হাকী ও ইবনে আসাকির; আল্লামা মুহাম্মদ মাদানী (র.) এর ‘হাদিসে কুদসী’ গ্রন্থের ৩৪৪ নং হাদিস: ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।)

এখানে লক্ষ্য করার বিষয় এই যে আল্লাহ জ্ঞানকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমটি তাঁর দেয়া জ্ঞান যা তিনি সৃষ্টির প্রথম থেকে তাঁর নবী-রসুলদের মাধ্যমে তাঁর কেতাবসমূহে মানবজাতিকে অর্পণ করে আসছেন, যার শেষ কেতাব বা বই হচ্ছে আল-কোর’আন। এটা হচ্ছে অর্পিত জ্ঞান। আর মানুষ পড়াশোনা, চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যে জ্ঞান অর্জন করে তা হলো অর্জিত জ্ঞান। মুসার (আ.) প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ নির্দিষ্ট করে ‘মানুষের অর্জিত জ্ঞান’ বললেন, শব্দ ব্যবহার করলেন ‘আন্-নাসু’, মানুষ। অর্থাৎ যে আল্লাহর অর্পিত জ্ঞান, অর্থাৎ দীন সম্বন্ধে জ্ঞান, এবং মানুষের অর্জিত জ্ঞান- এই উভয় প্রকার জ্ঞান অর্জন করতে থাকে এবং কখনোই তৃপ্ত হয় না অর্থাৎ মনে করে না যে তার জ্ঞানার্জন সম্পূর্ণ হয়েছে, আর প্রয়োজন নেই, সেই হচ্ছে প্রকৃত জ্ঞানী, আলেম। বর্তমানে যারা নিজেদের আলেম, অর্থাৎ জ্ঞানী মনে করেন, আল্লাহর দেয়া জ্ঞানীর সংজ্ঞায় তারা আলেম নন, কারণ শুধু দীনের জ্ঞানের বাইরে মানুষের অর্জিত জ্ঞানের সম্বন্ধে তাদের সামান্যতম জ্ঞানও নেই এবং সেই জ্ঞান সম্বন্ধে পিপাসাও নেই। জ্ঞান একটি প্রাকৃতিক সম্পদের মতো মানুষের জন্য আল্লাহর বিশেষ দান যা তিনি মানবজাতির কল্যাণার্থে দান করেন। এর কোনো ব্যক্তি মালিকানা থাকে না, যে কোনো জ্ঞানই গোটা মানবজাতির সম্পদ। তাই যারা জ্ঞানকে কুক্ষিগত করে রাখে তারা মানবতার শত্রু। যার জ্ঞান মানবতার কল্যাণে কাজে লাগে না, সেই জ্ঞান আখেরাতে তার কোনো কাজে আসবে না। আল্লাহর রসুল বলেছেন, “পূর্ববর্তী কেতাবে লিপিবদ্ধ আছে, আল্লাহ বলেছেন, “হে আদমের সন্তান! পারিতোষিক গ্রহণ ব্যতীত শিক্ষা দান কর, যেরূপভাবে তোমাদের পিতা পারিতোষিক দেওয়া ছাড়া শিক্ষালাভ করেছে।” (হাদিসে কুদসি- ইবনু লাল এই হাদিস ইবনে মাসউদ (রা.) এর সূত্রে সংগ্রহ করেছেন)।

যাই হোক, যারা সকল জ্ঞানের স্রষ্টা, উৎস আল্লাহ থেকে জ্ঞান বা এলেম অর্জন করবেন তাদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য থাকবে। এখানে আমরা প্রকৃত আলেম বলতে বুঝবো আল্লাহর রসুলের আসহাবগণকে যাদেরকে স্বয়ং রসুল নিজে ইসলাম শিখিয়ে গেছেন, ইসলামের জ্ঞান তাদের চেয়ে বেশি আর কারও থাকা সম্ভব নয়। রসুলের আসহাবগণের পরবর্তীতে যারা আলেম হতে চান তাদের চরিত্র ও কাজ আসহাবদের মতই হতে হবে। তা না হলে যত বড় টাইটেলধারীই হোন না কেন, যত বড় আলখেল্লাধারীই হোন না কেন তারা প্রকৃত আলেম নন। আল্লাহর ভাষায় তারা হলেন পুস্তক বহনকারী গাধা। (সুরা জুম’আ ৫)

[লেখক: সাহিত্য সম্পাদক, হেযবুত তওহীদ, ইমেইল: mdriayulhsn@gmail.com]

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.