সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর

সমাজ নিয়ে প্রত্যেককেই ভাবতে হবে -মো. মনিরুজ্জামান

0

স্টাফ রিপোর্টার:
————–
কালের প্রবাহে আজ আমরা এমন একটি শোচনীয় পরিস্থিতিতে উপনীত হয়েছি যেখানে ব্যক্তি নয়, ধ্বংসের মুখোমুখী দাঁড়িয়েছে আমাদের সমাজ। মনুষ্যত্ব হারিয়ে সামাজিক জীব মানুষ রূপ নিয়েছে অমানবিক প্রাণিবিশেষে। এমন কোনো অন্যায়, অপরাধ নেই যা আমাদের সমাজে হচ্ছে না। নিজের পিতা-মাতাকে জবাই দিতেও মানুষের আত্মা কাঁপছে না, কোলের শিশুর জীবন নিতে দ্বিধা আসছে না, কয়েকশ’ টাকার লোভে নৃশংসভাবে একজন আরেকজনকে হত্যা করছে। স্বার্থের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে সমস্ত ন্যায়, সত্য, সুবিচার। এমতাবস্থায় আর নির্লিপ্ত থাকা চলে না, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দল, মত নির্বিশেষে প্রত্যেককেই সমাজ নিয়ে ভাবতে হবে। গতকাল এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন হেযবুত তওহীদের রাজশাহী বিভাগের আমীর মো. মনিরুজ্জামান ।
তিনি আরও বলেন, মানুষ জন্মগতভাবে সামাজিক জীব। বেঁচে তাকার তাগিদে তাকে প্রতি ক্ষণে সমাজের সহায়তা গ্রহণ করতে হয়। সমাজকে দিয়ে এবং সমাজ থেকে নিয়ে মানুষের পথচলা। চিরকালই মানুষের পরম বন্ধু হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে তার সমাজ, তার আশেপাশের পরিচিত-অপরচিত মানুষগুলো। সমাজে মানুষে মানুষে সহযোগিতা-সহমর্মিতার মাত্রা যত বেশি থাকে সমাজ তত বেশি শক্তিশালী ও দৃঢ় হয়। আর সহযোগিতার পরিধি ক্ষুদ্র হলে সে সমাজ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুদ্রতায় ডুবে থেকে ধ্বংসের প্রহর গুনে। বর্তমানে আমাদের সমাজের হাল-হকিকত সকলেরই জানা। যাদের দৃষ্টি আছে, অন্ধকার নামলে তাদেরকে বলে দেওয়ার দরকার পড়ে না যে অন্ধকার নেমেছে, তা রাতের অন্ধকারই হোক আর মিথ্যার অন্ধকারই হোক, আর যাদের দৃষ্টি নেই, অন্ধকার কেন, মৃত্যুখাদের কিনারে দাঁড়িয়েও তারা নিজেদের নিরাপদ মনে করে।
আফসোস এই জাতির জন্য, এই কোটি কোটি মানুষের জন্য, যারা ইতোমধ্যেই বোধ-বুদ্ধি খুইয়ে নিজেদের ও অনাগত বংশধরের জন্য মৃত্যুউপত্যকা রচনা করেছে নিশ্চিন্তমনে, কোনো প্রকার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ব্যতিরেখে। পতনোন্মুখ এই সমাজের অবর্ণনীয় দুর্দশা দেখে, নির্যাতিত, নিপীড়িত, দুঃখ-কষ্টে কাতর মানুষের আর্তনাদ দেখেও যাদের কপালে ভাঁজ পড়ে না। ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় স্বচক্ষে দেখার পরও যারা খাচ্ছে-দাচ্ছে, চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য করছে কোনো প্রকার উদ্বেগ ছাড়াই, নির্বিকার চিত্তে। সমাজের এই অধঃপতন কি মানুষ উপলব্ধি করতে পারছে না? পারছে, আসলে সমস্যাটা ওখানে নয়, সমস্যা হচ্ছে- মানুষের স্বার্থবাদিতা তাকে সমাজের এই অধঃপতন রোধে করণীয় থেকে বিরত রেখেছে। স্বার্থ নামক সামাজিক মহামারিটি সমাজকে এতটাই গ্রাস করে ফেলেছে যে, দয়া, মায়া, মমতা তার কাছে গৌণ। অপরের কী হচ্ছে না হচ্ছে, সুখে-আছে নাকি দুঃখে আছে, খেতে পেল কি পেল না- তা দেখার বিষয় নয়। নিজ দেশকে ভুলে, নিজ সমাজকে ভুলে, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে নিজ পরিবার-পরিজনকে ভুলে মানুষ ব্যস্ত থাকছে নিজেকে নিয়ে। সমাজের প্রতিটি মানুষ আজ মোহাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অর্থের মোহ, ক্ষমতার মোহ, মান-সম্মানের মোহ বিবেক-বুদ্ধি, জ্ঞান-গরীমাকে করেছে অচল-অসার-নির্জীব।
মনিরুজ্জামান আরও বলেন, সমাজ হলো একটি ছাঁচ (গড়ষফ)। এই সাঁচে পড়ে ওই সমাজে বসবাসকারী মানুষের চরিত্র রচিত হয়। একটি মানবশিশু জন্মের সাথেই কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসে। যেমন শিশুটি ছেলে হলে এক ধরনের বৈশিষ্ট্য প্রাপ্ত হয়, মেয়ে হলে আরেক ধরনের। অর্থাৎ লিঙ্গভিত্তিক কিছু প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য সে জন্মগতভাবেই লাভ করছে। কিন্তু এটা লক্ষণীয়, এ বেশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে শারীরিক বৈশিষ্ট্য, মানসিক বা চরিত্রগত নয়। চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য হলো বৈধ-অবৈধ বা ন্যায়-অন্যায়বোধ, শিষ্টাচার, আদব-কায়দা, সহানুভূতি, দয়া-মায়া, ভালোবাসা, পরোপকারিতা ইত্যাদি। এই গুণগুলো একটি শিশু জন্মগতভাবে পায় না, এগুলো সে লাভ করে পরিবার, খেলার সাথী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা সমাজ থেকে। একে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় সামাজিকীকরণ।
পরিবার ও সমাজকে আলাদা করে দেখার উপায় নেই। কারণ পরিবার সমাজেরই একটি ক্ষুদ্রতম একক। একটি শিশু জন্মলাভ করার পর প্রথম সমাজের এই ক্ষুদ্রতম একক অর্থাৎ পরিবারের সাথে পরিচিত হয়। পরিবার থেকে সে আদব-কায়দা, শিষ্টাচার, প্রাথমিক ন্যায়-অন্যায়বোধ শিক্ষা লাভ করে। শিশুর জীবনে সর্বাধিক প্রভাব পড়ে পরিবারের। তার পরিবার যে ধ্যান-ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি ও ধর্মবিশ্বাস লালন করে ওই শিশুটিও সেদিকেই প্রবাহিত হয়। পরিবার যদি সুশৃঙ্খল হয়, রুচিশীল হয়, মার্জিত ও ভদ্র-সভ্য হয় সে পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুটিও সাধারণত সুশৃঙ্খল, মার্জিত রুচিশীল ও ভদ্র-সভ্য হয়। আর পরিবার যদি কলহপূর্ণ হয়, ঐক্যহীন হয় তাহলে শিশুও সেভাবে বেড়ে ওঠে।
তিনি সকলকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এখন আমরা যে অশান্তিপূর্ণ স্বার্থভিত্তিক সমাজে বসবাস করছি তার অনুকূলেই কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরের চরিত্র নির্মিত হবে। আমাদের সমাজ তো এমন ছিল না। কোথায় গেল বাঙালির চিরাচরিত সামাজিক ঐক্য, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য? কেন প্রকাশ্য দিনেদুপুরে একজন মানুষকে খুন করে খুনিরা শত শত মানুষের সামনে দিয়ে বীরদর্পে চলে যায় আর মানুষ দর্শকের ভূমিকা পালন করে, এমনকি কেউ ওই আহত ব্যক্তিকে টেনে তোলার সাহসটুকুও দেখায় না? কীভাবে আমাদের সমাজে স্বার্থবাদ এত প্রকট আকার ধারণ করল? এ প্রশ্নের উত্তর আজ হোক কাল হোক সন্ধান করতেই হবে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের সমাজব্যবস্থার শত শত বছরের ইতিহাস হচ্ছে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ইতিহাস। সে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে কীভাবে স্বার্থবাদভিত্তিক নতুন এক কলঙ্কজনক ইতিহাসের পথ রচিত হলো তা অবশ্যই ভাবার বিষয়।

Leave A Reply