এস. এম. সামসুল হুদা:
সম্প্রতি গত এপ্রিল মাসে দেশের দুটি ঘটনা সারাদেশে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। যা সারাদেশে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচিত হচ্ছে। এরমধ্যে গত ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানাধীন রয়েল রিসোর্টে জান্নাত আরা ঝর্ণাসহ হেফাজতে ইসলামের সাবেক নেতা মামুনুল হককে আটক করে স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও পুলিশ সেখানে উপস্থিত হলে ঝর্ণাকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করেন মামুনুল হক।

অপরদিকে গত ২৬ এপ্রিল সোমবার সন্ধ্যায় গুলশান-২ এর ১২০ নম্বর রোডের একটি ফ্ল্যাট থেকে মোসারাত জাহান মুনিয়ার ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে রাত দেড়টার দিকে গুলশান থানায় মামলা করেন ওই তরুণীর বোন নুসরাত জাহান। মামলায় বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহানের বিরুদ্ধে ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনার’ অভিযোগ আনা হয়। আর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই তরুণীর সঙ্গে বসুন্ধরা গ্রুপের এমডির ‘প্রেমের সম্পর্ক’ ছিল। তিনি ওই ফ্ল্যাটে যাতায়াতও করতেন। জানা যায়, মুনিয়া ঢাকার একটি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি কুমিল্লায়; পরিবার সেখানেই থাকে। তিনি ঢাকায় একাই থাকতেন গুলশানের ওই ফ্ল্যাটে। গত ১ মার্চ মুনিয়া ওই ফ্ল্যাটে উঠে। সব মিলে ১ লাখ ১১ হাজার টাকার ভাড়ার চুক্তি হয়েছিল বাড়িওয়ালার সঙ্গে।

প্রথমত দেশের ধর্মীয় অঙ্গনের সর্বোচ্চ নেতার ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’সহ মামুনুল হক আটকের পর থেকে স্যোশাল মিডিয়াসহ দেশীয় গণমাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। দেশের মিডিয়াগুলো প্রতিমূহূর্তে বিভিন্ন রকমের সংবাদ পরিবেশন করতে থাকে। মিডিয়া পাড়ায় টকশোতে চলতে থাকে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা। কিন্তু ওই মাসেরই শেষের দিকে মুনিয়ার মরদেহ উদ্ধারের পর বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন মিডিয়াতে চলে আসে।

তবে মুনিয়ার আত্মহত্যা’র প্ররোচনাদানকারী হিসেবে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের ছেলে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হলে অনেকটাই নিশ্চুপ হয়ে যায় দেশের মিডিয়াগুলো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দেশের অনেক মিডিয়া বিশেষ করে বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়াগুলো এ বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন একেবারেই বন্ধ করে দেয়। অন্যান্য মিডিয়া গুলো শুধুমাত্র যে সংবাদ পরিবেশন না করলেই নয় তা প্রকাশ করে আসছে।

দেশের প্রথম সারির কোন কোন সংবাদপত্রে এই খবরটি প্রথম পাতায় ছাপা হলেও কোন কোন পত্রিকায় খবরটি প্রকাশ করা হয়েছে বেশ গুরুত্বহীনভাবে ভেতরের পাতায়। বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন না হওয়া সত্ত্বেও এবং সরকারের দিক থেকে এই খবর প্রকাশের ব্যাপারে কোন ধরনের বিধিনিষেধ বা চাপ না থাকার পরও কেন এমনটি হলো- তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। আবার অনেকে খবরটি প্রকাশ করলেও সেখানে মামলার আসামী সায়েম সোবহান আনভীরের নাম উল্লেখ করা ছিল না, ছবিও প্রকাশ করেনি অনেকে। প্রশ্ন উঠেছে এটি নিয়েও।

রিসোর্টে মামুনুল হককাণ্ড ও আত্মহত্যার প্ররোচণায় বসুন্ধরার এমডি আনভীরের সংশ্লিষ্টতার ঘটনা নিয়ে দেশের মিডিয়াগুলোর দ্বি-মূখী নীতি নিয়ে সচেতন মহলে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্যোশাল মিডিয়ায় পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত দিচ্ছেন অনেকে। এক সাংবাদিক আক্ষেপ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন, “আমরা এখন করপোরেট কর্মকর্তা হয়ে গেছি, অফিসে যাচ্ছি-আসছি। আমরা এখন আর সাংবাদিক নেই।”

সাংবাদিক আনিস আলমগীর এ নিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, “আজ যেসব পত্রিকায়, এবং গতকাল পর্যন্ত যেসব অনলাইনে বা টেলিভিশনে বসুন্ধরার এমডি'কে নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত-প্রচারিত হয়নি, আপনি নিশ্চিত ধরে নেন, তারা মিডিয়ার মালিক হয়েছেন আপনাকে সংবাদ সরবরাহ করার জন্য নয়- নিজেদের অবৈধ ব্যবসা, নিজেদের এবং পরিবারের অপরাধ, অবৈধ কর্মকাণ্ড ঢাকার জন্য। অন্যের মিডিয়া তাকে কামড়ে দিলে পাল্টা কামড়ে দেয়ার জন্য।”

সারওয়ার-ই-আলম নামে একজন বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশে এক খোলা চিঠিতে লিখেছেন, “দেশে এতবড় একটা চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে গেল, অথচ আপনাদের কাগজে, পোর্টালে বা চ্যানেলে এ নিয়ে একটা খবরও চোখে পড়লো না, বিষয়টি আমার মতো পাঠককে যারপরনাই স্তম্ভিত, ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত করেছে। আপনারা কি নিজেদের প্রশ্ন করেছেন, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার দাবিতে আপনারা আবার কলম ধরবেন কীভাবে? সুশাসন, আইনের শাসন, ন্যায়বিচারের দাবিতে বড় বড় সম্পাদকীয় লিখতে আপনাদের কি এতটুকু লজ্জা করবে না?”

ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক শরিফুল হাসান এ বিষয়ে তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “মামলায় কারও নাম আসার মানে এই নয় যে তিনি অপরাধী। পুলিশ তদন্ত করবে, বিচার হবে। সাংবাদিকরা লিখবে, অনুসন্ধান করবে। কিন্তু দেখেন, এই ঘটনায় আসামির নাম শুনেই আটক হয়ে গেছে স্বাধীন সাংবাদিকতা। অথচ রাষ্ট্র-পুলিশ কেউ বলেনি এই অপরাধীর নাম লেখা যাবে না।”

শহীদ সাংবাদিক নিজাম উদ্দিনের মেয়ে শারমিন রিমার হত্যাকারী মুনিরের ঘটনাটিও দেশে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। প্রায় প্রতিদিনই এই বিষয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ করা হতো। মুনিরের মা দেশসেরা চিকিৎসকদের একজন ডা. মেহেরুন্নেসা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “মিডিয়া এইভাবে আমার ছেলের পিছনে না লাগলে তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হতো না।” তাহলে কি বিষয়টা এমন, মিডিয়া কারও বিচার চায় আবার কারও কারও বিচার হোক তা চায় না। প্রশ্ন উঠতে পারে, আইন, বিচার সব তো তার নিজস্ব গতিতে চলবে। সবাই তেমনটাই আশা করে। কিন্তু মিডিয়া সাংবাদিকতার ইথিক্স মেনে তার নিজস্ব গতিতে চলবে - নিইজ পোর্টাল বা সংবাদপত্রের পাঠক, টিভি দর্শক, সাধারন মানুষের এই প্রত্যাশা কী খুব বেশী কিছু।

দেশের শীর্ষস্থাণীয় ব্যক্তিদের প্রায় দুটি একই প্যাটার্নের ঘটনা নিয়ে মিডিয়ার এমন দ্বৈত নীতির কারণে দেশীয় মিডিয়া সমূহের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিডিয়াগুলির গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে যাবে। সাধারণ মানুষ মিডিয়ার বদলে স্যোশাল মিডিয়াকে তথ্য আদান প্রদানের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করবে। তাই এখনই মিডিয়ার সঠিক পথে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।