ডেস্ক রিপোর্ট:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল স্নায়ুযুদ্ধ, যার একদিকে ছিল পুঁজিবাদ, আরেকদিকে সমাজতন্ত্র। তখন সমাজতান্ত্রিক ব্লকের নেতৃত্বে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পুঁজিবাদী ব্লকের নেতৃত্বে ছিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। যুগের পর যুগ এই ঠান্ডা যুদ্ধ চলেছে। এরই এক পর্যায়ে নব্বইয়ের দশকে আফগান যুদ্ধ হলো এবং তার ধাক্কা সামলাতে না পেরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। তারপর থেকেই বিশ্বে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য চলছে।

কিন্তু বর্তমানে নতুন আরেকটি স্নায়ুযুদ্ধের আভাস পাচ্ছে বিশ্ব। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে গেছে আরেক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র চীন। আর বৈশ্বিক রাজনীতির এই নতুন পালাবদলের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে বিশ্বের ছোট বড় রাষ্ট্রগুলোকে। অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা, ভূরাজনৈতিক ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে রাষ্ট্রগুলো একাধিক বলয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। আর এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোন পক্ষ বেছে নিবে তা বিরাট প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের সাথে রয়েছে চীনের শত্রুতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সেই সুবাদে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে জোট গঠন করেছে চীনকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু বাংলাদেশ চায় ভারত ও চীন উভয়ের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে। তা কতটা সম্ভব তা নিয়ে বিশ্লেষকরা ভাবছেন। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসেন। ধারণা করা হচ্ছে, চীন জোটের সাথে আমেরিকা-ভারত জোটের চলমান স্নায়ুযুদ্ধে বাংলাদেশকে পাশে পেতেই চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সফরে এসেছিলেন।

ভারত ও চীনের দ্বন্দ্বে মধ্যখানে বাংলাদেশ:
ভারত মহাসাগরের পাশে অবস্থিত বাংলাদেশ নামক দেশটি ভূরাজনৈতিক কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য বহু পূর্ব থেকেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চেষ্টা চালিয়ে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশ “চেক এন্ড ব্যালেন্স” নীতি গ্রহণ করে সবার সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে এতদিন। বাংলাদেশ শত্রুতার বদলে বন্ধুত্ব স্থাপনকে নীতি হিসেবে নিয়েছে। আর তা করতে গিয়ে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকেই শুধু প্রধান্য দিয়েছে বাংলাদেশ। নিরাপত্তাজনিত কারণে কোনো পক্ষে বা বিপক্ষে জোট বাঁধায় আগ্রহ দেখায়নি দেশটি। এই নিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের জন্য ১৯৭৩ সালে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে যুক্ত হয়। তবে এখন যে পরিস্থিতি এসে দাঁড়িয়েছে, তাতে বাংলাদেশ কতটুকু নিরপেক্ষতা ধরে রাখতে পারবে সেটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারত ও চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফর: নেপথ্যে কী?
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো চীন, আর মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ভারত। বর্তমানে এই দু’টি দেশই আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য বাংলাদেশের উপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়।

২০১৬ সালে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এসেছিলেন বাংলাদেশ সফরে। তখন ওই সফরকে ঘিরেও কূটনৈতিক মহলে কৌতুহল বিরাজ করছিল। কারণ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফর সবসময়ই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। একটি পরাশক্তিধর রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী যখন অন্য কোনো দেশে সফর করেন, তখন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে সেটার ভিন্ন অর্থ ও তাৎপর্য অনুভূত হয়। কোনো প্রতিরক্ষামন্ত্রী যখন সফরে যায়, তখন ধরেই নেওয়া হয় সেটার পেছনে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কোনো বিষয় জড়িত আছে।

ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সফরে এসে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সামর্থ্য ও সক্ষমতা বাড়াতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। ভারতের গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের গবেষক অধ্যাপক ভরত কনরাড সেই সফরের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে চায় ভারত। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যে সাবমেরিন চুক্তি হয়েছে, তা থেকে বেইজিং হয়তো সুবিধা আদায় করতে চাইবে। কিন্তু মোদির সরকার তা হতে দেবে না।’

শুধু প্রতিরক্ষামন্ত্রীই নয়, সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের সেনাপ্রধানও বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। এরপরেই গত মঙ্গলবার হঠাৎ সাত ঘণ্টার এক রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে আসেন চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এ সময় তিনি রাষ্ট্রপতির সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের পাশাপাশি সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। নিশ্চয়ই কূটনৈতিক মহল বিষয়টাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং ভারতও এই সফরকে দৃষ্টির মধ্যে রেখেছে।

আলোচনায় কোয়াড, বাংলাদেশকে পাশে চায় চীন?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতির সাথে আলোচনায় চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কোয়াড নিয়ে চীনের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। কোয়াড হলো ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের মোকাবেলার জন্য অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত জোট। যতই আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার বাহানা দেওয়া হোক, এই জোট গঠনের আসল উদ্দেশ্য যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের আধিপত্য কমিয়ে চীনকে কোনঠাসা করা তা সহজেই অনুমেয়। এখন চীনও চাইছে কোয়াডের মোকাবেলায় নিজের জোট গড়ে তুলতে। আর সেজন্যই চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আনুষ্ঠানিক সফরে এসে কোয়াড নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি জানিয়ে গেলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত জোটের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে সঙ্গে চায় চীন।

চীন যেভাবে বাংলাদেশকে নিজের বলয়ে টেনে নিতে চাইছে, সেটা একটু কঠিনই বটে। কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সরাসরি বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়েছিল এই দেশটি। অথচ চীন একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যে সমাজতন্ত্রের চেতনার মধ্যেই রয়েছে নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের মুক্তির অঙ্গীকার। সেই চেতনাধারী রাষ্ট্র কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের নির্যাতিত নিপীড়িত অধিকারহারা মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছিল। বরং ভূরাজনৈতিক কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়ে নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লড়াইকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। কাজেই গত মঙ্গলবার সফরে এসে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সফরের শুরুতেই যখন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গেলেন, তখন অনেকেই অবাক হয়েছেন। কেননা এই প্রথম চীনের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে গেলেন। এমনকি ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে এলেও তিনি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানাতে যাননি।

বাংলাদেশ চীনের উপর কতটা নির্ভরশীল?
মুক্তিযুদ্ধে চীনের অবস্থান যা-ই হোক, বাংলাদেশ কিন্তু চীনকে উপেক্ষা করতে পারেনি। বরং অর্থনৈতিক, সামরিক ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে চীনের উপর বাংলাদেশকে ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। ১৯৭৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য কেনা সমরাস্ত্রের বড় উৎস হলো চীন। সম্প্রতি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যে সাবমেরিনটি কেনা হয়েছে সেটাও চীন থেকে। এছাড়া সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রয়োজনীয় বহু ধরনের সামগ্রী চীন থেকে কেনা হয়ে থাকে। সম্প্রতি সরকার কোভিড-১৯ এর টিকা নিয়ে উদ্ভূত সঙ্কট মোকাবেলায় চীন থেকে টিকা নেওয়ার কথা ভাবছে। কাজেই বিভিন্নভাবে চীনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার পর এখন বাংলাদেশ সরকার কতটা নিরপেক্ষতা বজায় রেখে ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে তা বিশ্লেষক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

চীনের প্রস্তাবে বাংলাদেশ কী বলেছে?
জানা গেছে, চীনের প্রস্তাবের জবাবে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি কোনো মন্তব্যই করেননি। পররাষ্ট্রসচিবের কাছে সাংবাদিকরা মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দেশের স্বার্থ সমুন্নত রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপাদান থাকলে বাংলাদেশ তাতে যুক্ত হবে। কোনো উদ্যোগে নিরাপত্তার বিষয়টি থাকলে বাংলাদেশ তাতে যুক্ত হবে না।’ অর্থাৎ বাংলাদেশের বার্তা পরিষ্কার। শুধু অর্থনৈতিক কোনো স্বার্থ ছাড়া বাংলাদেশ কোনো ধরনের সামরিক চুক্তি বা সামরিক বিষয়ে যোগ দিবে না। এটাকে বাংলাদেশ নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এই নীতির উপর কতদিন অটল থাকতে পারবে?

সামগ্রিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করে সচেতন মহলের আশঙ্কা হলো, পরাশক্তিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষিতে ধীরে ধীরে হয়ত দক্ষিণ এশিয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠবে, পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করবে। আর সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে, সাবধানে পদক্ষেপ নিতে হবে।