নিউজ ডেস্ক:
দেশের অর্থনীতির জন্য কর্ণফুলী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী। কারণ ওই নদী চ্যানেলেই দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর অবস্থিত। যার মাধ্যমে আমদানি-রফতানির ৯২ শতাংশ হয়ে থাকে। কিন্তু ওই নদীতে প্রায় ৭০ লাখ জনঅধ্যুষিত বন্দরনগরীর প্রতিদিনের প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন গৃহস্থালী বর্জ্য পড়ছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর গার্বেজ হচ্ছে অপচনশীল পলিথিন। দিনে দিনে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্যের বর্জ্যরে ৭ মিটার বা ২১ ফুটের স্তর জমে। ফলে ঝুঁকিতে পড়েছে বন্দর চ্যানেলের গভীরতা। এমন পরিস্থিতিতে অনেক আগেই কর্ণফুলী নদীতে বড় ধরনের একটি ড্রেজিং কার্যক্রম সম্পন্নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেও নানা জটিলতা তা দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে। অবশেষে চলতি বছরের মধ্যেই কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পুরো কাজ সম্পন্ন হবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আশাবাদী। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, কর্ণফুলী নদীর তলদেশের সর্বনাশা পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে স্তর সরাতে চীন থেকে আনা উচ্চক্ষমতার ড্রেজারেও কাজ হয়নি। বরং বর্জ্য তুলতে ওই শক্তিশালী খননযন্ত্রের নখদন্ত আঁচড় দিতেই পলিথিনে আটকে থেকে যাচ্ছিল। অতঃপর ওই ড্রেজার ফেরত পাঠিয়ে দেশীয় প্রযুক্তিতে কর্ণফুলীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং চলছে। ইতিমধ্যে ৩০২ কোটি টাকার প্রকল্পের ৪৭ শতাংশের কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা আগামী ২০২২ সালের মে মাস পর্যন্ত হলেও চলতি বছরের শেষ নাগাদই পুরো কাজ সম্পন্ন হবে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী।

সূত্র জানায়, বিগত ২০১৮ সালে কর্ণফুলী নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনা গ্রহণকালে নদীর তলদেশ থেকে ৪২ লাখ ঘনমিটার বর্জ্য উত্তোলনের কথা ছিল। কিন্তু সংশোধিত পরিকল্পনায় এখন ৫১ লাখ ঘনমিটার বর্জ্য তোলা হচ্ছে। ফলে প্রকল্প ব্যয় ২৫৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩০২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এখন নিয়মিত কাজ চলছে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও ড্রেজিং কার্যক্রমের অগ্রগতি স্বাভাবিক। তাছাড়া প্রকল্পের ব্যয়ও আর বাড়বে না বলে জানা যায়। তাছাড়া চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং আরো ১০ বছর আগে শেষ হওয়ার কথা ছিল। সেজন্য বিগত ২০১১ সালে মালয়েশিয়ান মেরিটাইম এ্যান্ড ড্রেজিং কর্পোরেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিও হয়েছিল। কিন্তু ২২৯ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু করার দুই বছর না যেতেই ওই প্রতিষ্ঠানটি কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে যায়। মূল ঠিকাদার কাজটি স্থানীয় এক প্রতিষ্ঠানকে সাব-কন্ট্রাক্টর নিয়োগ করে। কিন্তু স্থানীয় এজেন্টের ওই দক্ষতা ছিল না। ফলে ২০১৩ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষ মালয়েশিয়ান মেরিটাইমের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিটি বাতিল করে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ এনে প্রতিষ্ঠানটি আদালতে মামলা দায়ের করলে কর্ণফুলীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং আইনি জটিলতায় পড়ে যায়। কিন্তু কাজটি অত্যন্ত জরুরি হওয়ায় বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে পুনরায় ড্রেজিং কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমানে ‘সদরঘাট টু বাকলিয়ার চর ড্রেজিং প্রকল্প’ নামে কর্ণফুলী নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কাজ চলছে।

সূত্র আরো জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সঙ্গে ২০১৮ সালে ২৫৮ কোটি টাকার চুক্তি হয়। তবে নৌবাহিনীর তদারকিতে প্রকল্পের কাজ করছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের সিস্টার কনসার্ন ই-ইঞ্জিনিয়ারিং। বিগত ২০১৮ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ওই কাজ চলতি বছরের শেষ নাগাদ অর্থাৎ আগামী ড্রাই সিজনের আগে শেষ করা সম্ভব হবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ২০২২ সালের মে মাস পর্য রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কর্ণফুলীর তলদেশ থেকে ৫১ লাখ ঘনমিটার আবর্জনা তোলা হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে বালি, পলিথিন ও সকল ধরনের গৃহস্থালী বর্জ্য। তার মধ্যে হামিদ চর এলাকায় বালি ও মাটিগুলো ফেলা হচ্ছে। আর আরেফিন নগর এলাকায় ফেলা হচ্ছে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চীফ হাইড্রোগ্রাফার ও প্রকল্প পরিচালক কমান্ডার এম আরিফুর রহমান জানান, দফায় দফায় বড় ড্রেজারে কাজ করার চেষ্টা ব্যাহত হলেও এখন দেশীয় প্রযুক্তির ড্রেজার দিয়েই নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চলছে। বর্তমানে খনন কাজে ১৫টি ড্রেজার নিয়োজিত রয়েছে। কাজের অগ্রগতি ৪৭ শতাংশ। ইতিমধ্যে গত একমাসেই ১১ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের নভেম্বর মাসের মধ্যে শেষ করার টার্গেট নিয়ে কাজ এগিয়ে চলেছে।