বজ্রশক্তি ডেস্ক:

ধর্মব্যবসার ফাঁদে বইটি ২০১৭ সালের অক্টোবরে প্রথম প্রকাশের পর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ষষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ইতোমধ্যে দেড় লক্ষ কপি নিঃশেষ হওয়ার পর আরও ২০ হাজার কপি মুদ্রণ করা হয়েছে। বইটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে ব্যাপক পাঠক প্রিয়তা পেয়েছে। ডিজিটাল যুগে যখন সাধারণত কেউ বই না পড়তে, ইউটিউব-ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, সেই সময়ে অর্থাৎ বইয়ের পাঠকের অকালের যুগে এত অল্প সময়ে এত অধিক সংখ্যক বই বিক্রি হয়ে যাওয়া প্রমাণ করে বইটির অনন্য বৈশিষ্ট রয়েছে।
বিশটি অধ্যায়ের ৩৫০ পৃষ্ঠার সুখপাঠ্য বইটিতে নিঃসন্দেহে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত প্রায় সকল ধর্মের ধর্ম ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে, এর স্বপক্ষে অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে লেখক ভুল করেন নি। বিশেষ করে আমাদের দেশে ইসলাম নিয়ে যে ধর্ম ব্যবসা বিস্তার লাভ করেছে এ বিষয়টি অধিক গুরুত্ব পেয়েছে।
পৃথিবীতে প্রচলিত ধর্ম গ্রন্থ সমূহের অধিকাংশ ধর্মগ্রন্থে ধর্মের কাজের পার্থিব বিনিময় নেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সনাতন ধর্মের ধর্মগ্রন্থ সমূহে, বাইবেলে, ইহুদি ধর্মগ্রন্থে, মুসলমানদের কোর’আন ও হাদিসে সুস্পষ্টভাবে ধর্মব্যবসা নিষিদ্ধ। এমনকি কোরআনে মৃত জীব জন্তুর মাংস, রক্ত, শুকরের মাংস নিষিদ্ধ করা হলেও শর্তসাপেক্ষে স্রষ্টা ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু ধর্মের বা কোর’আনের কোনো কথা গোপন করা বা বিনিময়ে কোনো পার্থিব বস্তু গ্রহণ করাকে কোনো অবস্থায় ক্ষমার আওতায় আনা হয়নি। অর্থাৎ ইসলাম ব্যবহার করে আর্থিক বা রাজনৈতিক কিংবা গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিল করাকে কোনোভাবে ক্ষমা করা হবে না মর্মে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়া হয়েছে। যদিও আমরা দেখে আসছি ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে, মাদ্রাসার কোমলমতি ছাত্রদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা হচ্ছে, ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, অবৈধ অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য ইসলামকে ব্যবহার করা হচ্ছে আর যারা এসব করছেন তারা ইসলামের ধারক-বাহক হেফাজতকারী সেজে এসব অবৈধ ব্যবসা (ধর্মব্যবসা) করে যাচ্ছেন।
বইটিতে ধর্মব্যবসার সঙ্গা, সরূপ, বৈশিষ্ট্য, উৎপত্তি, কুফল, ফলাফল ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এককথায়, ধর্মব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে এ দালিলিক প্রমাণ সমৃদ্ধ গবেষণা গ্রন্থটিতে।
বইটির বিষয়বস্তু ও মূল ধারণা প্রকাশ করে গেছেন টাঙ্গাইলের পন্নী পরিবারের সদস্য ডা. মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। তারই সুযোগ্য উত্তরসূরী হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বিষয়টির আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিয়েছেন যা রেকর্ড শুনে কাল হরফে লিপিবদ্ধ করেছেন রিয়াদুল হাসান।
অষ্টম অধ্যায়ে ‘সর্বধর্মীয় পর্যালোচনা: কোনো ধর্মেই ধর্মব্যবসার বৈধতা নেই’ শিরোনামের গবেষণা প্রবন্ধে সনাতন ধর্মের ওঙ্কার শান্তির প্রতীক, ইসলাম শব্দটি এসেছে সালাম থেকে যার অর্থ শান্তি। পৃথিবী যখন অশান্তির অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়ে আছে, বিবেকবান মানুষেরা অস্বস্থিতে আছে, অনেক মানুষের মুখে আহার নেই, মসজিদ মন্দির থেকে জুতা চুরি হয়, যে সমাজে দুই বছরের শিশু ধর্ষিত হয়, সেখানে নির্বোধি আত্মকেন্দ্রিক মানুষগুলো মসজিদে গিয়ে মনে করেন ইবাদত করছেন, মন্দিরে গিয়ে দুধ কলা দিয়ে মনে করেন খুব উপাসনা হচ্ছে, মক্কা-গয়া-কাশি-বেথলেহেম-ভ্যাটিকান সিটিতে গিয়ে মনে করেন দেবতা-এনজেল-ফেরেশতারা স্বর্গ থেকে পুষ্প বর্ষণ করছেন; তারা ভ্রান্তির মধ্যে আছেন। স্রষ্টা কেবল উপাসনালয়ে থাকেন না; থাকেন আর্তপীড়িত নির্যাতিত মানুষের কাছে। মানুষের অশান্তি দূর করাই ধর্মের দৃষ্টিতে প্রকৃত ইবাদত। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ধর্মব্যবসার স্বরুপ কিছুটা ফুটে উঠেছে।
সম্পূর্ণ বইটি মনোযোগ সহকারে পড়লে ধর্মব্যবসার কদর্য রূপটা যেমন পাঠকের কাছে পরিষ্কার হবে তেমনি ধর্মব্যবসার প্রতি ঘৃণা অবজ্ঞা যাই বলি না কেন পাঠকের মনে প্রবল হবে।
এই গবেষণাধর্মী বইটিতে ‘ধর্মব্যবসা সৃষ্টির শিক্ষা ব্যবস্থা’ অধ্যায়ে বর্তমানে প্রচলিত মাদ্রাসা- কী আলিয়া, কী কওমি উভয় শেণির শিক্ষা ব্যবস্থাই যে ধর্মব্যবসায়ী সৃষ্টির উৎস তা সুনিপুণভাবে তথ্য-প্রমাণ, দলিলসহ উপস্থাপিত করা হয়েছে। ধর্মকে রুটি-রুজির হাতিয়ার বানানোর ফলে যুগে যুগে ধর্মগুলো স্বকীয়তা হারিয়েছে। ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা ধর্মগুলো লক্ষ্যচ্যূত হয়ে ধর্মই নিপীরণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই বিষয়েও ইতিহাস যুক্তি প্রমাণসহ বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে এই বইটিতে।
সর্বোপরি ধর্মের কাজের বিনিময়, এবাদতের পার্থিব মূল্য গ্রহণের পক্ষে ধর্মব্যবসায়ীরা কিছু খোঁড়া যুক্তি উপস্থাপন করে থাকে, আমরা খাবো কী, খলিফারাও পরিতোষিক গ্রহণ করতেন ইত্যাদি; সেই যুক্তিগুলো যে অসার তাও শব্দলেখক এর দৃষ্টি এড়িয়ে যায় নি। এক্ষেত্রেও যথেষ্ট পরিমাণ যুক্তি দলিলাদি বর্ণনা করে নিরঙ্কুশভাবে প্রমাণ করেছেন ধর্মব্যবসার পক্ষের অযৌক্তির যুক্তির অসারতা।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ধর্মব্যবসা মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বইটি যথেষ্ট অবদান রাখবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
তিনশত পঞ্চাশ পৃষ্ঠার বইটির বুকভ্যালু রাখা হয়েছে ২৬০ টাকা। তবে যে কোনো লাইব্রেরিতে ৮০-১০০ টাকায় বইটি কিনতে পাওয়া যায়। নিঃসন্দেহে বাজারদর বিবেচনায় এটা যথেষ্ট স্বল্পমূল্য। বইটি তওহীদ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে, প্রকাশক এস এম সামসুল হুদা বলেন, বইটির শব্দ-লেখক এবং অনুলেখক রয়্যালটি না নেওয়ার কারণে এত স্বল্পমূল্যে বইটি পাঠকের কাছে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
সাড়ে পাঁচ বাই নয় ইঞ্চি সাইজের ম্যাট লেমিনেটেড কভার দিয়ে মোড়ানো জুস সেলাইয়ের বইটিতে কভার ডিজাইনে দক্ষ শিল্পীমনার পরিচয় মিলেছে।
ধর্মব্যবসা নির্মূলের লক্ষ্যে বইটির ব্যাপক প্রসার বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে বিশ্বাসী বঙ্গবন্ধু কন্যার সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার দাবি রাখে।
বইটির কিছু কিছু অধ্যায় স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভূক্ত হলে কোমলমতি শিশুরাও শিশুকাল থেকেই ধর্মব্যবসার স্বরূপ চিনতে সক্ষম হতো যা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার পূর্বশর্তও বটে।

লেখক: তপন রশিদ, সম্পাদক, দৈনিক ঢাকা নিউজ