জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে বেগুন চাষে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। পোকামাকড়ের আক্রমণ ঠেকাতে ঘন ঘন কীটনাশক প্রয়োগ, সার ও কৃষি উপকরণের বাড়তি দাম, শ্রমিকের মজুরি, সেচ এবং যাতায়াত খরচসহ সব মিলিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। বাড়তি খরচ করেও অনেক জমিতে আশানুরূপ ফলন না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা।
চলতি মৌসুমে আগাম শীতের বাজার ধরতে আক্কেলপুর উপজেলায় প্রায় ২৫ হেক্টর জমিতে বেগুন চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সোনামুখী ইউনিয়নের দক্ষিণ রামশালা গ্রামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে এই আবাদ হয়েছে। আগাম বাজারে বেগুনের চাহিদা ও দাম বাড়বে, এমন প্রত্যাশায় কৃষকেরা আগেভাগে চাষ শুরু করলেও শুরুতেই পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণে তাদের সেই প্রত্যাশায় ভাটা পড়েছে।
সরেজমিনে দক্ষিণ রামশালা গ্রামের কয়েকটি বেগুনক্ষেত ঘুরে দেখা যায়, কোনো জমিতে গাছ সবুজ ও সতেজ থাকলেও অনেক জমিতে পাতায় পোকার আক্রমণের চিহ্ন রয়েছে। কোথাও আক্রান্ত ডাল কেটে ফেলা হয়েছে, আবার কোনো কোনো গাছ আগাম শুকিয়ে যাচ্ছে। গাছ রক্ষায় কৃষকেরা নিয়মিত কীটনাশক প্রয়োগ করছেন।
সাভারে ২৬ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশ সেজে ডাকাতি করা চক্রের ৩ সদস্য গ্রেফতার

কৃষকেরা জানান, বেগুনগাছে ফুল ও ফল আসার পর পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যায়। ফলে একাধিকবার কীটনাশক প্রয়োগ করতে হচ্ছে। এতে কীটনাশকের পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি, সেচ, সার, ক্ষেতের পরিচর্যা ও যাতায়াতসহ অন্যান্য খরচও বাড়ছে।
দক্ষিণ রামশালা গ্রামের মাজেদুল ইসলাম বলেন, “প্রতি বিঘা জমিতে বেগুন চাষে আমার ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে এক বিঘা জমিতে লম্বা জাতের বেগুন থেকে প্রায় ২০ মণ ফলন পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে ১০০ থেকে ২০০ কেজিও হচ্ছে না। অনেক গাছ অকালে মারা যাচ্ছে এবং আক্রান্ত ডাল কেটে ফেলতে হচ্ছে।”
কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “আমার এক বিঘা জমিতে বেগুনের আবাদ রয়েছে। সেখানে সাদামাছিসহ বিভিন্ন পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। সবজি নষ্টকারী এসব পোকা গাছের রস চুষে নেওয়ায় গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দফা কীটনাশক প্রয়োগ করেও তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।”
কৃষক জাহিদ হোসেন বলেন, “সার ও কীটনাশকের পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি এবং ক্ষেতে যাতায়াতের খরচও বেড়েছে। প্রয়োজনের সময় সার ও কীটনাশক না পাওয়ায় সমস্যা আরও বাড়ছে। সব মিলিয়ে চাষের খরচ অনেক বেড়ে গেছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী ফলন হচ্ছে না।”
আরেক কৃষক আব্দুল খালেক বলেন, “আক্কেলপুর কলেজ বাজারের কাঁচাবাজার ও উপজেলার তিলকপুর বাজারে জাতভেদে বেগুন বিক্রি করছি আমরা। বর্তমানে প্রতি মণ বেগুন প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।”
কৃষকদের অভিযোগ, ক্ষেত থেকে কম দামে বেগুন বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে দাম তুলনামূলক বেশি। তাদের দাবি, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি বেগুন ২০ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে কোনো কোনো সময় তা ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। এতে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে দামের বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, আক্কেলপুরের বিভিন্ন এলাকায় লম্বা, গোল, সাদা, কালো ও বেগুনি রঙের বিভিন্ন জাতের বেগুন চাষ হচ্ছে। জাতভেদে ফলন ও রোগবালাইয়ের প্রকোপেও পার্থক্য রয়েছে। তবে পোকামাকড়ের আক্রমণে অনেক কৃষকই কাঙ্ক্ষিত ফলন নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
কৃষকদের হিসাবে, প্রতি বিঘা জমিতে বেগুন চাষে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। জমি প্রস্তুত, চারা, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি ও যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে এই অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ফলন কমে গেলে উৎপাদন খরচ উঠে আসবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে আক্কেলপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার সাহা বলেন, “রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে কৃষকদের রক্ষায় মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা কাজ করছেন। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “চলতি মৌসুমে আক্কেলপুর উপজেলায় প্রায় ২৫ হেক্টর জমিতে বেগুন চাষ হয়েছে। রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, “কৃষকদের কৃষি কার্ড দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বর্তমানে গোপীনাথপুর ইউনিয়নের কাশিরা ব্লকে এ কার্যক্রম চলছে। পর্যায়ক্রমে উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার কৃষককে কৃষি কার্ডের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
তবে কৃষকদের দাবি, শুধু কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিলেই হবে না; আক্রান্ত ক্ষেতে সরেজমিনে গিয়ে রোগ ও পোকার ধরন শনাক্ত করে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সার ও কীটনাশকের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, উৎপাদন উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদিত বেগুনের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
কৃষকদের মতে, উৎপাদন খরচ কমানো, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে কার্যকর কৃষি পরামর্শ এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে বেগুন চাষে লোকসানের ঝুঁকি কমবে।

















