শৈশবে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারানো, আর অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই—জীবনের শুরুটা ছিল আমিনুল হক মাখনের জন্য কঠিন। কখনো ইট ভেঙেছেন, কখনো রডের কাজ করেছেন, করেছেন কৃষিকাজ ও টিউশনি। নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে বিসর্জন দিতে হয়েছে শৈশবের অনেক আনন্দ। তবে দারিদ্র্যের কাছে হার মানেননি তিনি। পরিবারের সদস্যদের ভালোবাসা, গ্রামবাসীর সহযোগিতা আর নিজের কঠোর পরিশ্রমে সেই মাখনই আজ বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত। ৪৬তম বিসিএসের পর ৪৯তম বিশেষ বিসিএসেও শিক্ষা ক্যাডারে গেজেটভুক্ত হয়েছেন তিনি। তাঁর এই সাফল্যে আনন্দিত পরিবার ও এলাকাবাসী।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম কান্দানিয়া ভাটিপাড়ায় জন্ম আমিনুল হক মাখনের। শৈশবেই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হওয়ায় মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হন তিনি। মাত্র ছয়-সাত মাস বয়সে মা চলে যাওয়ার পর বাবার কাছেই বড় হতে থাকেন। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় মাকে দেখার সুযোগ হয় তাঁর। কিন্তু সেই আশ্রয়ও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০১২ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারান মাখন। এরপর চাচা-চাচি, দাদি ও ফুফুরা তাঁকে আগলে রাখেন।
অভাবের সংসারে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় ইট ভাঙা ও রডের কাজ করেছেন। পাশাপাশি করেছেন কৃষিকাজ। নবম শ্রেণি থেকে শুরু করেন টিউশনি। নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে পড়াশোনার খরচ মেটানোর পাশাপাশি পরিবারকেও সহায়তা করতেন। অন্যদিকে, তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে নিতে এগিয়ে আসেন গ্রামের মানুষ। কেউ দিয়েছেন টাকা, কেউ কিনে দিয়েছেন খাতা-কলম, পোশাক কিংবা পরীক্ষার ফরম পূরণের খরচ।
ময়মনসিংহে ‘প্রকৃত ইসলাম প্রতিষ্ঠাই নারীমুক্তির একমাত্র উপায়’ শীর্ষক বিভাগীয় নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত

নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে আমিনুল হক মাখন জানান, তাঁর পড়াশোনার মোট খরচের প্রায় ৯৫ শতাংশই এসেছে গ্রামবাসীর সহযোগিতা থেকে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। চাচা রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন, আর তাঁদের বসবাস ছিল মাটির ঘরে। এমন পরিস্থিতিতে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পড়াশোনাকেই একমাত্র অবলম্বন হিসেবে বেছে নেন তিনি।
মাখন বলেন, ছোটবেলায় বন্ধুরা যখন মাঠে খেলত কিংবা বেড়াতে যেত, তখন তাঁকে কাজ করতে হতো। শিশু বয়সে এসব কষ্ট সহ্য করা কঠিন ছিল। অনেক সময় মনে হতো, সামনে এগিয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই। তবুও পড়াশোনা ছাড়েননি। অভাব আর প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন দেখেছেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর।
২০১৫ সালে কান্দানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ২০১৭ সালে শাহাবুদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন মাখন। এরপর ভর্তি হন তাঁর স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও আর্থিক সংকট থেকে মুক্তি মেলেনি। শিক্ষাবৃত্তি ও টিউশনি করে চালিয়ে যান পড়াশোনা। প্রতিদিন প্রায় সাত কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে কলেজে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু করেন সরকারি চাকরির প্রস্তুতি।
আমিনুল হক মাখন জানান, ২০২১ সালের মার্চ থেকে চাকরির প্রস্তুতিতে পুরোপুরি মনোযোগ দেন তিনি। কোনো কোচিং সেন্টারে ভর্তি না হয়ে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সহায়তায় প্রস্তুতি নেন। একের পর এক বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাঁচটি বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অবশেষে ৪৬তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। পাশাপাশি ৪৯তম বিশেষ বিসিএসেও শিক্ষা ক্যাডারে গেজেটভুক্ত হয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের এই স্বীকৃতি তাঁর জীবনের অন্যতম বড় অর্জন।
মাখনের জীবনের কঠিন সময়গুলোতে বাবা-মায়ের মতোই পাশে ছিলেন চাচা আবদুল খালেক ও চাচি মিনারা খাতুন। নিজেদের সন্তানের মতো করে তাঁকে বড় করেছেন তাঁরা। ভাতিজার সাফল্যে আবেগাপ্লুত চাচা আবদুল খালেক বলেন, সাত মাস বয়সে মাকে হারানোর পর অনেক কষ্ট করে মাখনকে বড় করেছেন। কখনো তাঁকে ভাতিজা হিসেবে আলাদা করে দেখেননি। তাঁর এই সাফল্যে পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘদিনের কষ্ট যেন সার্থক হয়েছে।
চাচি মিনারা খাতুনও মাখনকে নিজের সন্তানের মতোই লালন-পালন করেছেন। তিনি জানান, মাখনের বাবা মৃত্যুর আগে তাঁকে নিজের সন্তানদের সঙ্গে মাখনকেও সমান চোখে দেখার কথা বলে গিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কখনো তাঁকে আলাদা করে দেখেননি। আজ মাখনের সাফল্যে তাঁর সেই ত্যাগ ও ভালোবাসাও যেন পূর্ণতা পেয়েছে।
শুধু পরিবার নয়, মাখনের পাশে ছিল পুরো গ্রাম। স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ করিম জানান, স্কুলজীবন থেকেই তাঁরা মাখনকে সহযোগিতা করেছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী খাতা-কলম, পোশাক ও পড়াশোনার খরচ দিয়েছেন। কলেজে ফরম পূরণের সময়ও আর্থিক সহায়তা করেছেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, মাখন একদিন সফল হয়ে এলাকার মুখ উজ্জ্বল করবেন। আজ তাঁর অর্জনে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
এত বড় সাফল্যের পরও মাখনের মনে রয়ে গেছে গভীর আক্ষেপ। যাঁদের ত্যাগ ও ভালোবাসা তাঁকে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, সেই বাবা ও দাদি তাঁর এই অর্জন দেখে যেতে পারেননি। মাখন জানান, তাঁর দাদি সব সময় বলতেন, একদিন তিনি বড় কর্মকর্তা হবেন। তাঁর বাবা নিজের জীবনেও অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন, কিন্তু ছেলের সাফল্য দেখার সুযোগ পাননি। এই অপূর্ণতাই আজ তাঁর আনন্দের মধ্যে বেদনা হয়ে রয়ে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সাবিকুন্নাহার সিনথিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয় মাখনের। পরে ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁদের বিয়ে হয়। জীবনের কঠিন সময়গুলোতে স্ত্রীর কাছ থেকেও মানসিক সমর্থন পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
নিজের দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাফল্যের অভিজ্ঞতা থেকে মাখনের উপলব্ধি, জীবনে এগিয়ে যেতে সততা, পরিশ্রম ও ধৈর্যের বিকল্প নেই। পাশাপাশি সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করাও জরুরি। তাঁর বিশ্বাস, সততা, পরিশ্রম ও ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে গেলে জীবনের নানা ক্ষেত্রে সফল হওয়া সম্ভব।
ইট ভাঙা থেকে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার এই যাত্রা শুধু আমিনুল হক মাখনের ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি পরিবারের ত্যাগ, গ্রামবাসীর সহযোগিতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ।

















