ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়েছিল। অভাবের কারণে মাঝপথেই থেমে যায় পড়াশোনা। এরপর বিয়ে, সংসার ও সন্তান লালন-পালন করতে গিয়ে নিজের স্বপ্নকে দূরে সরিয়ে রাখেন। কিন্তু মনের ভেতর শিক্ষার প্রতি সেই আগ্রহ কখনো হারিয়ে যায়নি। অবশেষে ৫২ বছর বয়সে আবারও বই-খাতা হাতে তুলে নিয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন নীলফামারীর ডিমলার শেফালী বেগম। তাঁর এই সাফল্যে আনন্দিত পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসী।
শেফালী বেগম ডিমলা উপজেলার কালিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা। তিনি গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর এই অর্জন এলাকায় বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় বেশ মেধাবী ছিলেন শেফালী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের প্রতিটি ধাপে ভালো ফলাফল করেছিলেন তিনি। কিন্তু শৈশবেই বাবাকে হারানোর পর পরিবারে নেমে আসে আর্থিক সংকট। সংসারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে একসময় পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। জীবিকার তাগিদে বই-খাতা ছেড়ে সংসারের কাজে মনোযোগ দিতে হয় তাঁকে।
১২ শিক্ষক মিলে পাস করাতে পারলেন না কলেজের একমাত্র শিক্ষার্থীকে!

পরবর্তী সময়ে বিয়ে, সংসার ও সন্তানদের লালন-পালন নিয়ে কেটে যায় দীর্ঘ সময়। নিজের পড়াশোনা শেষ করার স্বপ্নটি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গেলেও মনের ভেতর তা সবসময়ই রয়ে যায়। সন্তানদের পড়াতে গিয়ে নিজের অপূর্ণ শিক্ষাজীবনের কথা বারবার মনে পড়ত তাঁর।
একপর্যায়ে দীর্ঘ বিরতি ভেঙে স্বামী ও তিন সন্তানের উৎসাহ ও সহযোগিতায় আবারও পড়াশোনা শুরু করেন শেফালী বেগম। বয়সের বাধা কিংবা দীর্ঘদিন পড়াশোনার বাইরে থাকার চ্যালেঞ্জ কোনো কিছুই তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে অবশেষে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় সফল হন তিনি।
শেফালীর সন্তানরাও উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর ছেলে আব্দুর রাজ শাফি দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনফরমেশন টেকনোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। অন্যদিকে মেয়ে মাখসূরা খানম নাজমুন রংপুর সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তরে পড়াশোনা করছেন। সন্তানদের শিক্ষাজীবনে অনুপ্রেরণা জোগানোর পাশাপাশি এবার নিজের শিক্ষাজীবনেও নতুন সাফল্য যোগ করলেন শেফালী।
গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রভাষক আব্দুল মান্নান বলেন, শেফালী বেগমের এই সাফল্য শুধু কলেজের নয়, পুরো সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো বয়সেই মানুষ নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। শেফালী তাঁর অর্জনের মাধ্যমে সেটিই প্রমাণ করেছেন।
শেফালীর নাতনি শারাফি রাজও দাদির সাফল্যে ভীষণ খুশি। সে জানায়, ৫২ বছর বয়সে দাদির এইচএসসি পাস করা তার কাছে অনেক বড় অনুপ্রেরণা। দাদির সাফল্য দেখে সে নিজেও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চায়। বড় হয়ে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে সে।
শেফালীর স্বামী মকছেদুল আলম বলেন, পরিবারের জন্য শেফালী নিজের অনেক স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন। দীর্ঘদিন পর নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছেন, এটাই তাঁদের পরিবারের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তাঁর এই অর্জনে সবাই গর্বিত এবং ভবিষ্যতেও পড়াশোনার পথে তাঁকে সহযোগিতা করবেন।
নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে শেফালী বেগম বলেন, ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর সংসারের চাপে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে মনের মধ্যে সবসময় পড়াশোনা শেষ করতে না পারার একটা কষ্ট ছিল। সন্তানদের পড়ানোর সময় নিজের সুপ্ত ইচ্ছাটিও আবার জেগে উঠত। স্বামী ও সন্তানদের সহযোগিতায় আবার কলেজে ভর্তি হয়ে পরীক্ষা দিয়েছেন এবং জিপিএ-৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এখন তাঁর মনে হচ্ছে, জীবনের একটি বড় অপূর্ণতা অবশেষে ঘুচেছে।
৫২ বছর বয়সে শেফালীর এই অর্জন শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প নয়; বরং দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ এবং বয়স যে শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না, তারই এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত।
















