একসময় প্রিয়জনের চিঠির অপেক্ষায় দিন গুনতেন মানুষ। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই ছুটে যেতেন দরজায়, চিঠি হাতে পেয়ে মুছে যেত অপেক্ষার সব ক্লান্তি। কিন্তু মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের যুগে হারিয়ে গেছে সেই চিঠির আবেদন। ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার শাখা ডাকঘরগুলোতেও এখন আর আগের মতো ব্যস্ততা নেই। অনেক ডাকঘরে ঝুলছে তালা, কোথাও আগাছায় ঢেকে গেছে প্রবেশপথ। একসময় যেখানে আসত প্রেমপত্র, সেখানে এখন মূলত সরকারি-বেসরকারি নিয়োগপত্র, আদালতের চিঠি আর তালাকনামা আসে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ডাকঘরগুলোতে প্রতি মাসে প্রায় ১৬০ থেকে ১৮০টি তালাকপত্র আসছে, অথচ গত কয়েক বছরে প্রেমপত্র আসার খবর নেই বললেই চলে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গৌরীপুর উপজেলার বেশ কয়েকটি শাখা ডাকঘরের অবস্থা নাজুক। কোথাও ডাকঘরে যাওয়ার নির্দিষ্ট রাস্তা নেই, কোথাও দরজার সামনে আগাছা ও আবর্জনার স্তূপ। আবার কোনো কোনো ডাকঘর দীর্ঘ সময় ধরে তালাবদ্ধ পড়ে রয়েছে। অথচ এসব ডাকঘরে সৌরবিদ্যুৎ, কম্পিউটার ও ল্যাপটপের মতো সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলোর অনেকগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেবার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পোস্টমাস্টাররা।
উপজেলার মাওহা ইউনিয়নের ভূটিয়ারকোনা শাখা ডাকঘরটি খুঁজে পাওয়া যায় জঙ্গলের মতো পরিবেশের মধ্যে। এর আশপাশে উচ্চবিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইউনিয়ন পরিষদ থাকলেও ডাকঘরে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট রাস্তা নেই। স্থানীয়দের ভাষ্য, পোস্টমাস্টারকে কবে সেখানে আসতে দেখেছেন, তা তাঁদের মনে নেই। ডাকঘরের দরজার সামনে আগাছা, গোবর ও আবর্জনা জমে রয়েছে।
মায়ের শখ পূরণে হাতির পিঠে চড়ে বিয়ে করতে গেলেন সাকিব!

একই ধরনের অবস্থা দেখা গেছে কিল্লাতাজপুর, অচিন্তপুর ইউনিয়নের মুখুরিয়া, মইলাকান্দা ইউনিয়নের লামাপাড়া ও ভবানীপুরসহ কয়েকটি শাখা ডাকঘরে। রামগোপালপুর, পাছারবাজার, শাহগঞ্জ ও বীরআহাম্মদপুর ডাকঘরেও গিয়ে তালা ঝুলতে দেখা গেছে। কোথাও ডাকঘরের অবস্থান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেই বিভ্রান্তি রয়েছে।
পাছার ডাকঘরের পোস্টমাস্টার মো. আতাউর রহমান ১৯৯১ সাল থেকে সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর স্মৃতিতে ডাকঘরের পুরোনো দিনগুলো ছিল অনেক বেশি প্রাণবন্ত। তখন চিঠি পৌঁছে দিতে গেলে গ্রামের ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে বকশিশও পেতেন ডাককর্মীরা। প্রিয়জনের চিঠি হাতে পেয়ে প্রাপকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু মোবাইল ফোনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্য হারিয়ে গেছে।
আতাউর রহমান জানান, গত মাসে তাঁর ডাকঘরে ১৪টি তালাকনামা এসেছে। এ ছাড়া আদালত ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার চিঠিও এসেছে। কিন্তু গত দুই থেকে তিন বছরে কোনো প্রেমপত্র আসেনি।
লামাপাড়া ডাকঘরের পোস্টমাস্টার ফরিদ উদ্দিন আহমেদ জানান, ডাকঘরে সরবরাহ করা ইলেকট্রনিক সরঞ্জামগুলো দেওয়ার পরপরই নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে, ভবানীপুর ডাকঘরের পোস্টমাস্টার মহসিন মাহমুদ শাহ বলেন, তাঁদের অফিসের ইলেকট্রনিক সরঞ্জামগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেগুলো জমা দেওয়া হয়েছে।
ডাক বিভাগের কর্মীদের অভিযোগ, স্বল্প বেতন ও প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবেও স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাছার ডাকঘরের পোস্টমাস্টার আতাউর রহমান জানান, তাঁরা মাসে ৪ হাজার ৪৬০ টাকা বেতন পান। পিয়নের বেতন ৪ হাজার ৩৫৪ টাকা এবং রানারের বেতন ৪ হাজার ১৭৭ টাকা। এত সীমিত বেতনের মধ্যেও তাঁরা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।
গৌরীপুর প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার আমিনুল ইসলাম বলেন, শাখা ডাকঘরগুলোর বিভিন্ন অনিয়ম ও সমস্যার অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর ভাষ্য, উপজেলা ডাকঘরের মাসিক অফিস খরচের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৮০ টাকা। এই অর্থ দিয়ে স্টেপলারের পিন কেনার খরচও মেটানো কঠিন। পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় ডাকঘরের কার্যক্রমও প্রত্যাশিতভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না।
আমিনুল ইসলাম আরও জানান, উপজেলার ১৪টি শাখা ডাকঘর ও উপজেলা ডাকঘর মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ১৬০ থেকে ১৮০টি তালাকনামা আসে। সে হিসাবে বছরে তালাকনামার সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, গৌরীপুরে বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে। গত বছরের নভেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো তরুণ-তরুণীর নামে প্রেমপত্র আসতে দেখেননি বলেও জানান তিনি।
প্রযুক্তির প্রসারে মানুষের যোগাযোগের ধরন বদলে গেছে। ব্যক্তিগত চিঠির জায়গা নিয়েছে মোবাইল ফোনের বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তবে গৌরীপুরের শাখা ডাকঘরগুলোর চিত্র শুধু প্রেমপত্র হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়; এর সঙ্গে উঠে এসেছে ডাকসেবার অবকাঠামোগত দুরবস্থা, প্রয়োজনীয় অর্থের সংকট এবং কর্মীদের সীমিত বেতনের বাস্তবতাও। একসময় মানুষের আবেগ ও অপেক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকা ডাকঘরগুলো এখন কীভাবে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কার্যকর সেবা দিতে পারবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

















