সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রঙ্গারচর ইউনিয়নের হাসাউড়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী আনারসের চাষ সম্প্রসারণ এবং দেশের স্বতন্ত্র কৃষিপণ্য হিসেবে সেটিকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে কৃষক, উদ্যোক্তা ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ সোমবার (৫ অক্টোবর) সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, হাসাউড়ার আনারসের জাত ও বৈশিষ্ট্য দেশের অন্যান্য এলাকার আনারসের তুলনায় একেবারেই আলাদা। এই আনারসকে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
সংস্কারের নামে মাদ্রাসা শিক্ষার স্বকীয়তা নষ্ট করা যাবে না: বিএমএ

তিনি বলেন, “আমি সুনামগঞ্জে যোগদানের পর স্থানীয় এক গণমাধ্যমকর্মীর মাধ্যমে হাসাউড়ার সুমিষ্ট আনারস সম্পর্কে অনেক কথা শুনি। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাসাউড়া গ্রামে গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, আনারসচাষি ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। তখন থেকেই এই ব্যতিক্রমী আনারস নিয়ে বড় কিছু করার চিন্তা করছি। এখন হাসাউড়ার আনারসের জিআই স্বীকৃতির জন্য আমরা কাজ করছি।”
জেলা প্রশাসক বলেন, হাসাউড়ার অনেক পরিবার সরাসরি আনারস চাষের ওপর নির্ভরশীল। এই আনারসের উৎপাদন অনেকাংশে বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে। বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হলে ফলনও বৃদ্ধি পায়।
তিনি আরও বলেন, হাসাউড়ার আনারস নিয়ে একটি সমন্বিত প্রকল্প তৈরির জন্য সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করে এই প্রকল্প তৈরি করা হবে। শুধু হাসাউড়া নয়, জেলার অন্যান্য উপজেলার টিলা ও উঁচু জমিতেও এই জাতের আনারসের চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদের উৎসাহিত করা হবে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভাটি সঞ্চালনা করেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আল আমিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান। স্বাগত বক্তব্য দেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) আদিত্য পাল, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমসহ কৃষি বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তা, আনারসচাষি ও উদ্যোক্তারা।
কৃষকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন আরব আলী এবং চান মিয়া সর্দার। এ ছাড়া নারী উদ্যোক্তা তৃষ্ণা আক্তার রুশনাও সভায় বক্তব্য দেন। সভার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন হাসাউড়া গ্রামের বাসিন্দা ও বৈশাখী টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি কর্ণবাবু দাস।
মতবিনিময় সভায় কৃষকেরা আনারস পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তাদের অভিযোগ, হাসাউড়া থেকে সুনামগঞ্জ শহরে আনারস নিয়ে আসার পথে বিভিন্ন স্থানে চাঁদা দিতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে যায় এবং বাজারে পৌঁছানোর আগেই আনারসের দাম বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে বাগান থেকেই কম দামে আনারস বিক্রি করে দেন।
কৃষকেরা আরও জানান, ধান ও সবজি চাষিরা নিয়মিত কৃষিঋণের সুবিধা পেলেও আনারসচাষিরা সহজে ঋণ পান না। আনারস বাগানের জমির কাগজপত্র দেখিয়ে ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা জটিলতা পোহাতে হয়। তাই সহজ শর্তে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা, ফলন বৃদ্ধির জন্য শুষ্ক মৌসুমে বাগানে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আনারসের বাজারজাতকরণে সরকারি সহায়তার দাবি জানান তারা।
কৃষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সভায় বক্তারা জানান, আগামী আনারস মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট পৌরসভাকে বিষয়টি জানানো হবে, যাতে হাসাউড়ার আনারস বিক্রেতারা ন্যূনতম খাজনার বিনিময়ে নির্ধারিত স্থানে আনারস বিক্রির সুযোগ পান। এ ছাড়া বাগানে পানি সরবরাহের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং কৃষকদের সমস্যা ও দাবিগুলো প্রস্তাবিত প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
স্থানীয় কৃষকদের আশা, সরকারি উদ্যোগে হাসাউড়ার আনারস দ্রুত জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেলে এ অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী আনারস চাষের পরিধি আরও বাড়বে। এতে কৃষকদের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং দেশের বাজারে হাসাউড়ার আনারসের স্বতন্ত্র পরিচিতি আরও শক্তিশালী হবে।

















