‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—মানবতাবাদী সাধক ফকির লালন শাহের এই চিরন্তন বাণীকে ধারণ করে আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) থেকে শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসব। বাউলসম্রাটের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয়েছে নানা অনুষ্ঠান। আগামী ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এ আয়োজন।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় অবস্থিত লালন আখড়াবাড়িতে স্মরণোৎসব ঘিরে সমবেত হবেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধু, বাউল-সাধক, ভক্ত, গবেষক ও দর্শনার্থীরা। লালনের মানবতাবাদী দর্শন, জাত-ধর্মের বিভেদ অতিক্রম করে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা এবং বাংলার লোকসংস্কৃতিতে তাঁর অবদান স্মরণে আয়োজন করা হয়েছে এ উৎসবের।
আজ সন্ধ্যায় ছেঁউড়িয়ার লালন একাডেমি চত্বরে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন এ আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন লালন একাডেমির সভাপতি ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান।
রংপুরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেত্রী প্রমা গ্রেফতার!

উৎসবে লালনভক্তরা নিজস্ব রীতি ও আচার অনুসরণ করে সাধনা, গান ও স্মরণপর্বে অংশ নেবেন। একতারা, দোতারা ও খমকের সুরে পরিবেশিত হবে লালনের গান। গানের আসর ঘিরে শিল্পী ও শ্রোতাদের মধ্যে তৈরি হবে ভাবের আদান-প্রদান। পাশাপাশি থাকবে আনুষ্ঠানিক নানা আয়োজন।
২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত জাতীয় দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ওই বছর থেকেই জাতীয় পর্যায়ে লালন উৎসব উদ্যাপন শুরু হয়।
১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন লালন শাহ। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছর লালন আখড়াবাড়িতে সমবেত হন ভক্ত ও বাউল-সাধকেরা। লোকসংগীত, আধ্যাত্মিক সাধনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এ মিলনমেলা নতুন প্রজন্মের কাছে লালনের জীবনদর্শন তুলে ধরারও গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
লালন শাহ বাংলার লোকদর্শন, মানবতাবাদ ও আত্মঅনুসন্ধানের এক অনন্য নাম। তিনি শুধু বাউল গানের রচয়িতাই নন; তাঁর গানে উঠে এসেছে মানুষের পরিচয়, আত্মার স্বরূপ, দেহতত্ত্ব এবং জাত-ধর্মের বিভেদ অতিক্রম করে সত্য অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা। সমাজের প্রচলিত বিভেদ ও সংকীর্ণতাকে প্রশ্ন করার পাশাপাশি তাঁর গান মানুষকে নিজের ভেতরেও অনুসন্ধান চালাতে উদ্বুদ্ধ করে।
‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’ গানে জাতপাত ও সামাজিক পরিচয় নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন এই সাধক। অন্যদিকে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানে উঠে এসেছে মানবদেহ ও জীবনের রহস্য। সহজ কথায় গভীর দর্শন প্রকাশের অসাধারণ ক্ষমতা লালনের গানকে বিনোদনের গণ্ডি ছাড়িয়ে আত্মজিজ্ঞাসা ও জীবন উপলব্ধির মাধ্যমে পরিণত করেছে।

















