দেশের গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়াকে কেন্দ্র করে সীমান্তের ওপার থেকে একটি মহল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, গত ৫০ বছরে গড়ে ওঠা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো দেশের সম্পদ। এসব কারখানা ধ্বংস হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষ। একই সঙ্গে খুলনা থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত হাজার হাজার শিল্পকারখানা গড়ে তুলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করছে সরকার। বৃহস্পতিবার বাগেরহাট ও খুলনা সফরে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার কাটাখালী মোড় এলাকায় এক পথসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত প্রায় ৫০ বছরে দেশে গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। কিন্তু একটি মহল নিজেদের স্বার্থে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করতে চায়। গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা সীমান্তের ওপার থেকে কলকাঠি নেড়ে শ্রমিকদের দাবির আড়ালে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন কলকারখানায় গিয়ে কিছু লোক যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করছে, গাড়ি ও অন্যান্য সম্পদ নষ্ট করছে। অথচ কোনো শ্রমজীবী মানুষ নিজের কর্মসংস্থানের জায়গা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করতে পারেন না। কারখানাগুলো ধ্বংস হলে শ্রমিকদের পাশাপাশি তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চুরির চেষ্টার অভিযোগে ধাওয়া, ডাবগাছে উঠে সাড়ে তিন ঘণ্টা আটকা যুবক!

শ্রমিকদের মজুরি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া রয়েছে। এসব দাবি পর্যালোচনা করে নতুন মজুরি নির্ধারণের জন্য সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ড ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণ করা হবে। তবে শ্রমিকদের দাবিকে কেন্দ্র করে কেউ যেন দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সরকার গঠন করতে পারলে দেশের মানুষের জন্য কাজ করবে। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা বিভিন্ন মিল-কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, একসময় খুলনা ছিল দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। এখানে অসংখ্য মিল-কারখানা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার বাগেরহাট, খুলনা, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড় পর্যন্ত হাজার হাজার শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে চায়। এর মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দীর্ঘদিন অবহেলিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে।
এদিকে বিকেলে খুলনা মহানগরীর ডাকবাংলা মোড়ে আকস্মিক এক পথসভায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি বলেন, একসময় দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত খুলনার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা হবে। এ জন্য বন্ধ শিল্পকারখানা দ্রুত চালু, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সফরসূচিতে না থাকলেও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের অনুরোধে পথসভায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রটোকল উপেক্ষা করে বাস থেকে নেমে সরাসরি উপস্থিত জনতার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি। পরে খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সামনে নির্মিত মঞ্চে বক্তব্য দেন।
এর আগে সকালে মোংলা সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘মোংলা বন্দর সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ শীর্ষক মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রকল্পের আওতায় বন্দরে দুটি জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বন্দরের পণ্য ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে বন্দরের ৯ নম্বর জেটিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের মহাপরিকল্পনার অন্যতম প্রাথমিক ধাপ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিপিং কোম্পানিগুলোর কাছে মোংলা বন্দরকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে এটিকে জাহাজ ভেড়ানোর প্রথম পছন্দের বন্দর হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যেতে পারে। যথাসময়ে আধুনিকায়নের কাজ শেষ হলে এ অঞ্চলে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়বে। এ জন্য বন্দর ও আশপাশের এলাকায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) চেয়ারম্যান দাই হেগেনের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের চীনা প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে। এ সময় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পে বিনিয়োগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
পাশাপাশি ইনভেস্ট বাংলাদেশ ও চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের মধ্যে বিনিয়োগ সহযোগিতা-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। প্রধানমন্ত্রী চীনা বিনিয়োগকারীদের মোংলাকে কেন্দ্র করে জ্বালানি, সবুজ অবকাঠামো, লজিস্টিকস ও পরিবহন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহম্মেদ মোস্তফা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ঘণ্টায় ৩০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং বছরে চার লাখ টিইইউএস কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা চালু হলে বন্দরটি দেশের প্রথম স্মার্ট বন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বাগেরহাট ও খুলনার বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিএনপির নেতাকর্মীরা।
















