বাংলাদেশি নাটকের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক গড়েছে সামাজিক ধারাবাহিক ‘দুনিয়া টাকার গোলাম’। ইউটিউবে নাটকটির মোট ভিউ ১০০ কোটি ছাড়িয়েছে। বড় কোনো তারকা কিংবা বিশাল বাজেট ছাড়াই গল্প, অভিনয় ও নির্মাণশৈলীর মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করেছে প্র্যাঙ্ক কিংস এন্টারটেইনমেন্টের ব্যানারে নির্মিত এই ধারাবাহিক। মাত্র ৪৬ পর্বেই শত কোটি ভিউয়ের এই অর্জন বাংলা নাটকের ডিজিটাল অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে যাত্রা শুরু করা নাটকটি অল্প সময়ের মধ্যেই দর্শকদের নজর কাড়ে। নির্মাতা সাইদুর রহমান সবুজের পরিচালনায় প্রচলিত পারিবারিক নাটকের বাইরে গিয়ে এতে যুক্ত করা হয়েছে হালকা অ্যাকশন, রহস্য ও রোমাঞ্চ। পরিচিত তারকাদের ওপর নির্ভর না করে গল্পের শক্তি এবং অভিনয়শিল্পীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ধারাবাহিকটি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
পরিচালক সাইদুর রহমান সবুজ দৈনিক কালবেলাকে জানান, গতানুগতিক পারিবারিক নাটকের ধারা থেকে বেরিয়ে পারিবারিক আবহের সঙ্গে অ্যাকশন ও থ্রিলের মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। তারকানির্ভর কাস্টিংয়ের পরিবর্তে পুরো দলের সমন্বিত প্রচেষ্টাই এই সাফল্যের অন্যতম কারণ। নাটকটির একটি পর্ব প্রকাশের মাত্র ১১ ঘণ্টায় ১ কোটি ভিউ পাওয়ার ঘটনাও দর্শকদের আগ্রহের প্রমাণ বলে মনে করেন তিনি।
শরিফুল রাজকে আইনি নোটিশ, ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম প্রযোজকের!

নাটকটির গল্প ও চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন আর্থিক সজীব। তার ভাবনায় উঠে এসেছে অর্থের প্রতি মানুষের অন্ধ মোহ এবং এর কারণে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তনের চিত্র। কীভাবে টাকার জন্য ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, রক্তের সম্পর্কের চেয়ে অর্থ বড় হয়ে ওঠে কিংবা আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে একজন মানুষ পরিবারে অবহেলার শিকার হন—এসব বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে ধারাবাহিকটিতে।
চিত্রনাট্যকার আর্থিক সজীব জানান, বিশ্বজুড়ে প্রচলিত কনটেন্টের ধারা এবং নির্দিষ্ট দর্শকগোষ্ঠীর চাহিদা বিবেচনায় রেখে সচেতনতামূলক এই গল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েন এবং চারপাশের সামাজিক বাস্তবতা থেকেই গল্পের উপাদান সংগ্রহ করেছেন তিনি। প্রতিটি পর্বের শেষে দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখতে রাখা হয়েছে রহস্য ও নাটকীয়তা। শত কোটি ভিউয়ের এই অর্জনের কৃতিত্ব দর্শকদের দিয়েছেন তিনি। তবে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে নয়, গল্পের স্বাভাবিক গতির ওপর নির্ভর করেই ধারাবাহিকটির সমাপ্তি নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন এই চিত্রনাট্যকার।
ধারাবাহিকটির বিশেষ একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম। প্রধান চরিত্রে রয়েছেন শোয়েব শান্ত, লামহা আনসু ও তৈয়েবা তুলনা। এ ছাড়া শফিউল রাজ, ঈশান সাব্বির, সুমন পাটোয়ারী, মুকুল সিরাজ, ফাবিহা ফ্রিয়া, বাঁধন খান, মাসুদ আলম, রাজ আরিয়ান ও মাসুদ হারুনসহ আরও অনেকে অভিনয় করেছেন।
নাটকটির জনপ্রিয়তা বাড়াতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও রয়েছে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন আবেগঘন দৃশ্য ও সংলাপের ছোট ছোট অংশ ফেসবুক রিলস, টিকটক ও ইউটিউব শর্টসে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ক্লিপের মাধ্যমে নতুন দর্শক নাটকটির প্রতি আগ্রহী হয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিটি পর্বের তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত দৈর্ঘ্য এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা দর্শকদের পরবর্তী পর্ব দেখার আগ্রহ বাড়িয়েছে।
তবে এত জনপ্রিয়তার মধ্যেও সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে ৪০তম পর্বের পর কিছু দর্শক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গল্প দীর্ঘ করার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক পর্বগুলোর রহস্য ও নাটকীয়তা দর্শকদের একটি বড় অংশের আগ্রহ ধরে রেখেছে।
এদিকে পাইরেসির আশঙ্কায় ওটিটি প্ল্যাটফর্মে প্রচারের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে ইউটিউবেই নিয়মিত পর্ব প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয় নির্মাণসংশ্লিষ্টরা। ভবিষ্যতে নাটকটির প্রোডাকশন ভ্যালু ও অভিনয়শিল্পীদের তালিকা আরও সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিচালক।
সব মিলিয়ে ‘দুনিয়া টাকার গোলাম’-এর ১০০ কোটি ভিউয়ের মাইলফলক বাংলা নাটকের ইউটিউবভিত্তিক দর্শকপ্রিয়তার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তারকানির্ভরতা ছাড়াও শক্তিশালী গল্প ও দলীয় প্রচেষ্টায় যে বিপুল দর্শকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব, ধারাবাহিকটির সাফল্য সেই সম্ভাবনাকেই সামনে এনেছে।
















