ওবায়দুল হক বাদল:
রাজধানী ঢাকায় অরাজনৈতিক ও অসাম্প্রদায়িক সামাজিক সংগঠন ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’-এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের শুভ সূচনা ও কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (২ নভেম্বর) বিকাল ৩টায় বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ ভবনের কনফারেন্স হলে এ উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির আহ্বায়ক ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। তিনি সংগঠনের অন্যান্য সদস্যদের সাথে নিয়ে ফিতা কেটে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উদ্বোধন করেন।
সভাপতির বক্তব্যে ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বলেন- সরকার ও রাষ্ট্র সকলের। এই দেশ সকল ধর্ম, বর্ণ, পাহাড়ি, সমতল সকল নাগরিকের। আর নাগরিকদের নিরাপত্তা, বাকস্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সকলের মানবাধিকার নিশ্চিত করার আশা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়েই সবার জন্য বাংলাদেশ কাজ করছে। এই প্লাটফর্ম নিয়ে সারাদেশে কাজ করার জন্য সরকারের কাছে তিনি সার্বিক সহায়তা কামনা করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সবার জন্য। এই দেশে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেক মানুষের এদেশে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করার, কথা বলার, ধর্ম বিশ্বাস ধারণ করার, সংস্কৃতি লালন করার অধিকার রয়েছে। এগুলো একজন নাগরিকের মানবাধিকার, সাংবিধানিক অধিকার।
আন্দোলন নয়, বিরোধী দলকে সংসদে এসে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান চিফ হুইপের!

“ধর্ম-বর্ণ-দল-বিশ্বাস নির্বিশেষে প্রত্যেকের বাকস্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা ও সংগঠন করার স্বাধীনতা দেশের সংবিধান ও আন্তজার্তিক আইনে স্বীকৃত। এই অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়েই ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ এর যাত্রা” -বলেন তিনি।
এর আগে তিনি বলেন, বাংলাদেশ কেবল একটি ভূখণ্ডের নাম নয়- এটি বিভিন্ন জাতিসত্তা, ধর্ম, মত ও সংস্কৃতির দীর্ঘ সহাবস্থান, বৈচিত্র্য ও সম্প্রীতির এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার। নানা দেশ ও জাতির মানুষের আগমন, বিভিন্ন ধর্ম-মতের বিকাশ এবং বহু সংস্কৃতির মেলবন্ধনেই গড়ে উঠেছে এই ভূখণ্ডের সমাজ-সংসার। যুগ থেকে যুগান্তরে ভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেছে, একে অপরের উৎসব-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতিকে সম্মান জানিয়েছে।
‘কিন্তু আজ সেই ঐতিহ্য নানা দিক থেকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বৈশ্বিক উগ্রবাদের কালো ছায়া এসে পড়েছে এই লাল-সবুজের মানচিত্রের ওপরও। বিশেষত বিগত কয়েক বছরে মব-সন্ত্রাস এমন এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে চরম অসহায় হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অনিরাপদ শহরে পরিণত হয়েছে আমাদের রাজধানী ঢাকা’ -বলেন ইমাম সেলিম।
তিনি আরো বলেন, এখানে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে মানুষের নিরাপত্তা, স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা। প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে আমাদের হাজার বছরের সম্প্রীতিপূর্ণ সহাবস্থানের সংস্কৃতিও। এই বাস্তবতায় আর নীরবতা নয়, নিরপেক্ষতার নামে নিষ্ক্রীয়তা নয়- এখন প্রয়োজন অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানো। সেই লক্ষ্যেই আমাদের পথ চলা।
তিনি বলেন, আজ ইসলামের নামে চালানো হচ্ছে মব সন্ত্রাস। অথচ ইসলাম মানুষের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে, এমনকি কোরআনেই ফিতনাকে হত্যার চেয়েও গুরুতর বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কাজেই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে কথিত তওহীদী জনতাকে উসকে দিয়ে ভাঙচুর চালায়, তাহলে একে কোনোভাবেই ইসলাম রক্ষার কাজ বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ধর্মের দোহাই দিয়ে চলা এসব উগ্র কর্মকাণ্ড একদিকে যেমন সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, অন্যদিকে ইসলামবিদ্বেষীদের হাতে অপপ্রচারের নতুন হাতিয়ার তুলে দিচ্ছে। ফলে তারা সহজেই ইসলামের সুমহান শিক্ষা ও সৌন্দর্যের বিরুদ্ধে নানা বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।
সংগঠনের যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহবুব আলম মাহফুজের সঞ্চালনায় সংগঠনের অন্যন্য নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। এসময় মশিউর রহমানকে সংগঠনের মুখপাত্র হিসেবে সর্বসম্মতিক্রমে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী, সাংবাদিক বাসুদেব ধর, স্টিয়ারিং মেম্বার মনীন্দ্র কুমার নাথ, বীর মুক্তিযোদ্ধা চিত্ত ফ্রান্সিস রিবেরু, যুগ্ম আহ্বায়ক সুফী আল্লামা হানিফ নূরী, এস এম সামসুল হুদা, শাহ সুফি তৌহিদুল ইসলাম চিশতি নিজামী, সদস্য সচিব ক্যাপ্টেন (অব.) এম এমদাদুল হক, যুগ্ম সদস্য সচিব মেজর বিজয় ম্যানুয়েল ডি প্যারিস, কার্যনির্বাহী সদস্য এডভোকেট অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য, এডভোকেট সুশান্ত কুমার বসু, এডভোকেট নূর হোসেন, আক্তার হোসেন, মোঃ শরিফুল ইসলাম, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন জনি, ডা. জয়দেব ভট্টাচার্য, আসমা হোসেন, বহ্নি বেপারী, খন্দকার নাজিম উদ্দিন, নাঈম আহমেদ, ফকির মোহাম্মদ মকবুল হোসেন, সুফি আব্দুস সাত্তার ফারাজি, বন্যা সাত্তার, শাহ সুফি পীরজাদা মোখলেসুর রহমান, মোঃ হেলাল প্রমুখ।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন
ড. এটি এম মমতাজুল করিম, সম্পাদক, দেশের ডাক পত্রিকা ও সভাপতি সার্ক কালচারাল সোসাইটি, রুফায়দাহ পন্নী, সম্পাদক, দৈনিক দেশেরপত্র, মো. সিরাজুল ইসলাম আকাশ, মহাসচিব, জাতীয় জোট।
সভায় সংগঠনের সদস্য ফরম প্রণয়ন ও এর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে বেশ কিছু প্রস্তাবনা গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি সংগঠনের বিভিন্ন খাতের ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছতার সঙ্গে সভায় উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া সাংগঠনিক কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা এবং দেশব্যাপী কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা করা হয়।
সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটে গত ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে। ওই সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমকে আহ্বায়ক করে ৭০ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বিএমএ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটি গঠন ও পরিচিতি সভায় সাবেক নৌবাহিনী কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন (অব.) এম. এমদাদুল হককে সদস্য সচিব নির্বাচিত করা হয়।
সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী, ধর্ম, বর্ণ, জাতিগত পরিচয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করবে তারা। পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, সামাজিক বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা দূর করে বিদ্বেষহীন, মানবিক ও সম্প্রীতিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে সংগঠনটি।
ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় সংগঠনটির উদ্যোগে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ৩১ অক্টোবর নরসিংদী জেলা প্রেস ক্লাবে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। এতে সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ধর্মীয় প্রতিনিধি, বাউলশিল্পী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। এর আগে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, সিলেট, টাঙ্গাইলেও সংগঠনটির উদ্যোগে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সংগঠনটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা, নাগরিক অধিকার ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে জেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম, মতবিনিময় ও সামাজিক সচেতনতামূলক নানা আয়োজন অব্যাহত রেখেছে।

















