মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনার বাইরে শিক্ষার্থীদের আনন্দময়, সৃজনশীল ও বাস্তবমুখী শিক্ষায় অভ্যস্ত করতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে নতুন চারটি পাঠ্যবই যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ নামে বই চারটি চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) প্রণীত বইগুলো জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বই চারটির প্রায় দেড় কোটি কপি মুদ্রণ করা হবে।
শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীল চিন্তাশক্তি এবং হাতে-কলমে কাজের দক্ষতা বাড়ানোই নতুন বইগুলোর মূল লক্ষ্য। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে আনন্দময় শিক্ষা, খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা ও কারিগরি দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে নতুন বইগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি গড়ে তোলার পাশাপাশি কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করাও এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
‘চুমু দেওয়া শিক্ষক ও রাজনৈতিক নেতার কাজ নয়’: রাশেদ খাঁন

এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানান, নতুন চারটি পাঠ্যবইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এনসিসির অনুমোদনের পর বইগুলোর বিষয়বস্তু মুদ্রণের জন্য ছাপাখানায় পাঠানো হবে। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকুর প্রত্যাশা, আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি কপি বই ছাপানোর কাজ শেষ হবে।
গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের পরামর্শের ভিত্তিতে চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।
চতুর্থ শ্রেণিতে খেলাধুলা ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি ‘খেলাধুলা’ বইটি ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সুস্থ জীবনযাপন, শরীরচর্চা ও খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তোলাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবার মতো খেলার নিয়মকানুন সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
পাশাপাশি কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো আত্মরক্ষার কৌশল, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং খেলাধুলার সময় আঘাত পেলে করণীয় বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কেটে যাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া কিংবা হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়গুলো ছবির মাধ্যমে বোঝানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পুষ্টি, সামাজিক দক্ষতা ও দেশপ্রেমের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বইটিতে।
বইটির একটি গল্পে প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষার্থীদের মেয়েদের ফুটবল দল গঠন এবং সামাজিক বাধা পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের অনুপ্রেরণামূলক অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে খেলাধুলাকে শুধু বিনোদন নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, সুস্থতা ও ভবিষ্যৎ পেশা গঠনের সম্ভাব্য পথ হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, ১১টি অধ্যায়ে প্রণীত ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইয়ে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক রীতিনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা স্থান পেয়েছে।
বাংলা বর্ণমালার চর্চা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং পিঠা-পুলির ঐতিহ্যের পাশাপাশি পরিবারে পারস্পরিক সহযোগিতা ও যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে এর সূচনার সঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং বিজয়ীদের ছবি অন্তর্ভুক্ত করার কথা রয়েছে।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে আনন্দময় শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতা
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি ছয়টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। পড়াশোনার ভয় ও পরীক্ষার চাপ কমিয়ে আনন্দময় অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক আলোচনা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শেখার সুযোগ তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।
বইটিতে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পাঠ্যবিষয়কে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে শেখাকে শুধু মুখস্থ করা কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত করার চেষ্টা করা হবে।
অন্যদিকে, আটটি অধ্যায়ে প্রণীত ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটির লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখা, সমস্যা সমাধান এবং প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগে দক্ষ করে তোলা। বইটিতে কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি, ছোট উদ্যোগ গড়ে তোলার সম্ভাবনা, উৎপাদনমুখী কাজ, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপনের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা যাতে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন না করে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে শেখে এবং ভবিষ্যতে কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে, সে লক্ষ্যেই বইটি তৈরি করা হয়েছে। নতুন চারটি বইয়ে শব্দকোষের মতো সহায়ক অংশও যুক্ত করার কথা জানিয়েছে এনসিটিবি।
পরবর্তী সময়ে আরও শ্রেণিতে চালুর পরিকল্পনা
শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানিয়েছেন, চতুর্থ শ্রেণিতে শুরু হতে যাওয়া খেলাধুলা ও সংস্কৃতিবিষয়ক বই দুটি পরবর্তী সময়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এবং কারিগরি শিক্ষাবিষয়ক বই দুটি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম শওকত আলী খান বলেন, নতুন পাঠ্যবইগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।
সব মিলিয়ে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে নতুন চারটি বই চালুর এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রচলিত পাঠ্যক্রমে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, আনন্দময় শিখন ও কারিগরি দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে বইগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন, মুদ্রণ এবং শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানোর বিষয়টি নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ওপর নির্ভর করছে।
















