কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. আমির হামজার নির্বাচনী হলফনামা, আয়কর রিটার্ন ও আর্থিক তথ্যে একাধিক অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। নগদ অর্থ, ব্যাংক জমা, কৃষিজমি, আবাসিক প্লট, গাড়ি, স্বর্ণালংকার ও নির্বাচনী ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে তথ্যের গরমিল তুলে ধরে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন সাবেক ছাত্রদল নেতা মো. সিরাজুল ইসলাম।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া ওই আবেদনে আমির হামজার সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের বিভিন্ন তথ্যের তুলনামূলক বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, নির্বাচনী হলফনামা ও আয়কর রিটার্নের মধ্যে একাধিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। এসব তথ্য যাচাই না করলে প্রকৃত সম্পদ ও আয়ের চিত্র স্পষ্ট হবে না।
আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩০ জুনের আয়কর রিটার্নে আমির হামজার ব্যাংক ব্যালেন্স শূন্য দেখানো হয়েছে। অথচ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির কুষ্টিয়া শাখায় তার একটি হিসাবে ৬৮ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ টাকা জমা ছিল বলে দাবি করেছেন আবেদনকারী।
বড়দিন উদযাপনে ২ কোটির বদলে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী!

এ ছাড়া নির্বাচনী হলফনামায় তার নগদ অর্থের পরিমাণ ২ লাখ ৪৫ হাজার ১৭০ টাকা দেখানো হলেও আয়কর রিটার্নে দেখানো হয়েছে ৩৮ লাখ ৪৫ হাজার ১৭০ টাকা। দুই নথির মধ্যে ৩৬ লাখ টাকার পার্থক্য রয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমির হামজার বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া আয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারী। তার দাবি, আমির হামজা প্রতি শুক্রবার আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এক লাখ টাকা এবং বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত সম্মানী পান। তবে এসব আয়ের তথ্য নির্বাচনী হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করা হয়নি। আয়কর রিটার্নে তার বার্ষিক আয় ৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে, যার পুরোটাই হামজা এন্টারপ্রাইজের কাপড় ও বইয়ের ব্যবসা থেকে এসেছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে ব্যাংক হিসাবের বিস্তারিত তথ্য হলফনামায় উল্লেখ না করা এবং তার স্ত্রীর আয়কর রিটার্নের তথ্য প্রকাশ না করার বিষয়টিও আবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
কৃষিজমির হিসাবেও দুই নথির মধ্যে অসংগতির অভিযোগ করেছেন সিরাজুল ইসলাম। তার দাবি, নির্বাচনী হলফনামায় আমির হামজার কৃষিজমির মূল্য ১১ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা দেখানো হলেও আয়কর রিটার্নে এর মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে ১৪ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা।
অন্যদিকে তার স্ত্রীর কৃষিজমির পরিমাণ হলফনামায় ১২ কাঠা বা ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ দেখানো হয়েছে। অথচ আয়কর রিটার্নে ১২০ শতাংশ জমির তথ্য রয়েছে বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে। দুই নথিতে জমির মূল্যেও ১৫ লাখ টাকার পার্থক্য রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর নিবন্ধিত ৬৪৯৮ নম্বর দলিলের মাধ্যমে আমির হামজার স্ত্রী ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ জমি কিনেছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জমিটির মোট মূল্য ছয় লাখ টাকা এবং তার স্ত্রীর অংশের মূল্য ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ টাকা। আবেদনকারীর অভিযোগ, এই সম্পত্তির তথ্যও নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি।
কুষ্টিয়া শহরের রাহিনী মৌজায় আমির হামজার নিজের নামে ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ জমির একটি আবাসিক প্লট থাকার কথাও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে কেনা ওই জমির বর্তমান আনুমানিক মূল্য ৬০ লাখ টাকা বলে দাবি করেছেন সিরাজুল ইসলাম। তবে হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে এ সম্পত্তির তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ তার।
এ ছাড়া আমির হামজার স্ত্রীর নামে বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বাড়িভাড়ার আয়, ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৯-১৭৫৭ নম্বরের গাড়ি, ১১৬ দশমিক ৬৪ গ্রাম স্বর্ণ এবং পাঁচতলা ভবন ও জমির মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আবেদনকারীর দাবি, গাড়িটির মূল্য নির্বাচনী হলফনামায় ২৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা দেখানো হলেও আয়কর রিটার্নে এর তথ্য নেই। একইভাবে আয়কর রিটার্নে ১০ ভরি স্বর্ণের তথ্য থাকলেও নির্বাচনী হলফনামায় তা উল্লেখ করা হয়নি।
নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনী বিভিন্ন খাতে ৩৪ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এরপর ১০ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন পরিচালনার ব্যাংক হিসাব থেকে আরও ৩৮ লাখ টাকা নগদ উত্তোলন করা হয়। সব মিলিয়ে নির্বাচনী ব্যয় ৭২ লাখ টাকা হয়েছে বলে দাবি করেছেন আবেদনকারী। এই ব্যয় নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে কি না, তা তদন্তের অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
পাশাপাশি হলফনামায় বার্ষিক পারিবারিক ব্যয় ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৭৬০ টাকা দেখানো হলেও চালকের বেতন, ইউটিলিটি বিল ও সন্তানদের শিক্ষাব্যয়ের মতো খরচ যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পাঁচতলা ভবন ও জমির সম্মিলিত মূল্য ১ কোটি ৬৮ লাখ ৭৩ হাজার ১৮৩ টাকা দেখানো নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন আবেদনকারী।
আবেদনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর সংশ্লিষ্ট বিধান উল্লেখ করে বলা হয়েছে, নির্বাচিত কোনো প্রার্থীর হলফনামা কিংবা আয়-ব্যয়ের বিবরণীতে অসংগতি বা মিথ্যা তথ্য পাওয়া গেলে নির্বাচন কমিশন তদন্ত করতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, যানবাহন নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ এবং ভূমি ও নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের নথিপত্র যাচাইয়ের অনুরোধ জানিয়েছেন সিরাজুল ইসলাম। প্রয়োজনে মূল দলিল উপস্থাপন করে তদন্তে সহযোগিতা করার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন তিনি।
আবেদনকারী সিরাজুল ইসলাম ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে বর্তমানে তিনি সাধারণ ব্যবসায়ী এবং রাজনীতির সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন।
তিনি বলেন, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সংসদ সদস্যের নির্বাচনী হলফনামায় বিভিন্ন জায়গায় আর্থিক তথ্যের অসংগতি দেখতে পেয়েছেন। বিষয়টি জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন আলেমের কাছ থেকে এমনটি প্রত্যাশা করেননি। এ কারণে অভিযোগ করেছেন এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য আমির হামজার বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
















