দেশের বাজারে আবারও বেড়েছে এলপিজি ও অটোগ্যাসের দাম। ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম একলাফে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। একই সঙ্গে যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও লিটারে ১১ টাকা ৫৩ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। রোববার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টা থেকে নতুন এ দাম কার্যকর হয়েছে। বিইআরসি বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকোর এলপিজির দাম এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
বিইআরসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অক্টোবর মাসের জন্য সৌদি আরামকোর নির্ধারিত প্রোপেন ও বিউটেনের সৌদি কনট্রাক্ট প্রাইস বা সৌদি সিপির ভিত্তিতেই দেশে এলপিজির নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। অক্টোবরে প্রোপেনের সৌদি সিপি প্রতি টন ৬৮০ ডলার এবং বিউটেনের ৭৩০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এলপিজির মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে প্রোপেন ও বিউটেনের অনুপাত ৩৫:৬৫ ধরে গড় সৌদি সিপি প্রতি টন ৭১২ দশমিক ৫০ ডলার হিসাব করেছে বিইআরসি।
এর আগে সেপ্টেম্বরে প্রোপেনের সৌদি সিপি ছিল প্রতি টন ৬২৫ ডলার এবং বিউটেনের ৬৬০ ডলার। সে সময় গড় সৌদি সিপি ছিল ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এলপিজির প্রধান কাঁচামালের গড় আন্তর্জাতিক মূল্য প্রতি টনে ৬৪ দশমিক ৭৫ ডলার বেড়েছে। বিইআরসির হিসাবে, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে এলপিজির নতুন দামে।
৭০ বছর পর আসাম থেকে নৌপথে বাংলাদেশে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু!

শুধু সৌদি সিপি নয়, এলপিজি আমদানির সঙ্গে যুক্ত জাহাজ ভাড়া ও ব্যবসায়ীর প্রিমিয়ামও অক্টোবরের মূল্য নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলেছে। অক্টোবর মাসে এ খাতে প্রতি টনে ২৫০ ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে। অথচ সেপ্টেম্বরে একই খাতে প্রতি টনে ১৬০ ডলার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। ফলে এক মাসের ব্যবধানে জাহাজ ভাড়া ও ব্যবসায়ীর প্রিমিয়ামের হিসাবেও প্রতি টনে ৯০ ডলার বেড়েছে।
অন্যদিকে, অক্টোবরের মূল্য সমন্বয়ের সময় প্রতি ডলারের গড় বিনিময় হার ১২৩ টাকা ১৮ পয়সা ধরা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ ডলারের বিনিময় হারে সামান্য পরিবর্তন হলেও আন্তর্জাতিক এলপিজি মূল্য এবং আমদানি-সংক্রান্ত ব্যয় বৃদ্ধিই এবার দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে লিটারপ্রতি ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ অটোগ্যাসের দাম বেড়েছে লিটারে ১১ টাকা ৫৩ পয়সা।
তবে সরকারি নির্ধারিত দাম বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। দাম বাড়ানোর পরও দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহ সংকট পুরোপুরি কাটেনি। অনেক জায়গায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে, যা বিইআরসির নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক বেশি।
এলপিজির দাম ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব পড়ছে বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি পরিবহন খাতেও। অটোগ্যাসের দাম বাড়ায় যানবাহনের পরিচালন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত পরিবহন ও বিভিন্ন পণ্যের খরচেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে এলপিজির বাজারে চলমান অস্থিরতার জন্য ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা একে অপরকে দায়ী করছেন। এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির অভিযোগ, ২০ সেপ্টেম্বরের পর আমদানিকারকরা সরবরাহ প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন। এমনকি ২৫ সেপ্টেম্বরের পর কয়েকটি ডিপো থেকেও সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা।
তবে আমদানিকারকরা কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরাই দায়ী। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম বৃদ্ধি, এলপিজি আমদানিতে জাহাজ ভাড়া ও ব্যবসায়ীর প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়া—এসব কারণ দেখিয়ে অক্টোবর মাসে এলপিজি ও অটোগ্যাসের দাম বাড়িয়েছে বিইআরসি। তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি এবং বাজারে সরবরাহ সংকট অব্যাহত থাকায় ভোক্তাদের দুর্ভোগ কতটা কমবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

















