কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি:
দোকানের সামনে বসে কাঠের গায়ে শেষ আঁচড় দিচ্ছিলেন এক কারিগর। পাশে পড়ে আছে তৈরি করা কয়েকটি ঢাক, ঢোল, খোল ও বিভিন্ন দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো। তাকজুড়ে সাজানো রয়েছে নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র। অথচ যে সময়ে বাদ্যযন্ত্র তৈরির ব্যস্ততায় কারিগরদের দম ফেলার সময় থাকার কথা নয়, সেই দুর্গাপূজার মৌসুমেও চারপাশজুড়ে নেমে এসেছে চরম নীরবতা।
রংপুরের কাউনিয়ার ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারিগরদের জীবনে এখন এমনই স্থবিরতা নেমে এসেছে। একসময় পূজা, বিয়ে, পালাগান, যাত্রা কিংবা লোকসংগীতের আসর মানেই ছিল ঢাক-ঢোল ও দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের বিপুল কদর। কিন্তু আধুনিক বাদ্যযন্ত্র, ডিজিটাল মিউজিক এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন কমে যাওয়ায় হাতে তৈরি এসব বাদ্যযন্ত্রের চাহিদা এখন অনেকটাই কমে গেছে। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ পেশায় থাকা পরিবারগুলো চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
কাউনিয়ার রংপুর-কুড়িগ্রাম সড়কের ‘শিবু তাল তরঙ্গ’ দোকানের কারিগর সুবাস চন্দ্র দাস প্রায় ২৫ বছর ধরে বাদ্যযন্ত্র তৈরির কাজ করছেন। তার পরিবারও প্রায় ৩০ বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, “দুর্গাপূজার সময় আগে যেখানে ৩০ থেকে ৩৫টি বাদ্যযন্ত্র তৈরির অর্ডার পাওয়া যেত, এবার সেখানে এখন পর্যন্ত ১০টি কাজের অর্ডারও মেলেনি। আগে সারা বছরই কমবেশি কাজ থাকত। এখন অনেক সময় কাজ ছাড়া অলস বসে থাকতে হয়। পূজার মৌসুমেও আমাদের কাজ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।”
তালাবদ্ধ ঘর থেকে দুর্গন্ধ কক্ষে মিলল বৃদ্ধার মরদেহ!

আরেক কারিগর শিবু চন্দ্র দাস বলেন, এক যুগ আগেও বর্ষাকাল ছাড়া প্রায় সারা বছরই তাদের ব্যস্ততা থাকত। বর্তমানে মাঝে মধ্যে খোল তৈরি কিংবা পুরোনো বাদ্যযন্ত্র মেরামতের সামান্য কাজ আসে। এতে আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি এই পেশাটি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
শুধু কারিগরদের আয়ই কমেনি, সেই সাথে কমেছে লোকসংগীতের নানা আয়োজনও। স্থানীয় কণ্ঠশিল্পী সতীশ চন্দ্র বলেন, “রংপুরের ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াইয়া, পল্লিগীতি, বাউল, কবিগান ও পালাগানের আসর এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না। এসব আয়োজন কমে যাওয়ায় হাতে তৈরি দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের চাহিদাও তলানিতে ঠেকেছে।”
তিস্তা ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আ. সালাম বলেন, “গ্রামগঞ্জে গ্রামীণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারও হ্রাস পেয়েছে। এসব ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি এগুলোকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
কাউনিয়া সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনসার আলী বলেন, “বর্তমানে উপজেলায় মাত্র দুটি দোকানে ৪ থেকে ৬ জন কারিগর বাদ্যযন্ত্র তৈরির পেশার সঙ্গে কোনোমতে যুক্ত রয়েছেন। প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় বা বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া না হলে ঐতিহ্যবাহী এসব বাদ্যযন্ত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শুধু ইতিহাস বা স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে।”
কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পাপিয়া সুলতানা বলেন, “আধুনিকতার ছোঁয়ায় ঢাক-ঢোল, তবলা, একতারা ও দোতারার চাহিদা কমেছে। কারিগরদের জীবনমান উন্নয়নে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয় চেষ্টা করা হবে।”
কাউনিয়ার এই কারিগরদের কাছে বাদ্যযন্ত্র তৈরির কাজটি শুধু একটি পেশা নয়, এটি তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু সময়ের সাথে সেই ঐতিহ্যের বাজার ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। দুর্গাপূজার মণ্ডপে ঢাকের শব্দ এখনও শোনা যায়, তবে সেই ঢাক তৈরির কারিগরদের জীবনে আগের মতো কোলাহল আর ব্যস্ততার সুর আর নেই।

















