মেয়ের বন্ধুত্ব নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন মা। বান্ধবী ভালো নয়—এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি। মেয়েকে চোখে চোখে রাখতেন, নিয়মিত খোঁজখবর নিতেন। ঘটনার দিন বিকেলেও মেয়ের সঙ্গে কথা বলে জানতে চেয়েছিলেন বান্ধবীর নাম ও বাসার ঠিকানা। বলেছিলেন, ‘তোর বান্ধবীর নাম বল, বাসার ঠিকানা বল, বাসায় গিয়ে নিয়ে আসব।’ কিন্তু মায়ের সেই উদ্বেগ আর সতর্কতার পরও শেষ পর্যন্ত মেয়েকে আর ফিরিয়ে আনতে পারেননি তিনি। কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের মৃত্যুতে এখন শোকের ছায়া পরিবারজুড়ে। এ ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তবে হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং অন্য কেউ জড়িত কি না, তা এখনো তদন্তাধীন।
বিকেল ৪টায় শেষ কথা, মেয়েকে আনতে চেয়েছিলেন মা
তাজমিনের মা কেয়া খাতুনের বক্তব্যে উঠে এসেছে মেয়েকে নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের উদ্বেগ এবং শেষ কথোপকথনের স্মৃতি। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের এক বান্ধবীকে ভালো মনে না হওয়ায় প্রায় ছয় মাস তাজমিনকে স্কুলে যেতে দেননি তিনি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে সতর্ক থাকার চেষ্টা করতেন সব সময়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের পিকআপ খাদে, দুই আসামিসহ আহত ৫!

ঘটনার দিন বিকেল ৪টার দিকে মেয়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয় তাঁর। তখন তাজমিন এক বান্ধবীর বাসায় থাকার কথা জানায়। এ সময় মেয়ের কাছে বান্ধবীর নাম ও বাসার ঠিকানা জানতে চান মা। তাঁকে বাসায় গিয়ে নিয়ে আসার কথাও বলেন। কিন্তু তাজমিন বান্ধবীর পরিচয় ও ঠিকানা জানিয়েছিল কি না, সে বিষয়ে মায়ের বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে।
এরপর কী ঘটেছিল, কার সঙ্গে তাজমিনের দেখা হয়েছিল কিংবা কীভাবে সে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকায় পৌঁছাল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। মেয়েকে নিয়ে মায়ের আগের উদ্বেগের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা-ও নিশ্চিত নয়।
ধানক্ষেতে মিলল স্কুলছাত্রীর মরদেহ
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সে কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কাঁচিকাটা-হরিশ্চর পাকা সড়কের জগতপুর উত্তরপাড়া এলাকার মানুমুড়া সংলগ্ন স্থানে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তাঁরা। পরে সড়ক থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে ফসলি জমির আইলের পাশে এক কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা।
মরদেহটির গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। খবর পেয়ে লালমাই থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে সিআইডি ও পিবিআইসহ পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। মরদেহের পাশে থাকা অটোরিকশাটিও জব্দ করা হয়।
অটোরিকশাচালক সুমন গ্রেফতার
তাজমিনকে বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমনকে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরীতে তাঁর ভাইয়ের বাসা থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর আগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁর খালা শাশুড়ি, বোন ও বোনজামাইকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সুমনকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এ ঘটনায় সুমনের এককভাবে জড়িত থাকার সম্ভাবনার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত কি না, তা-ও তদন্ত করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সুমন প্রায়ই রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ও আশপাশের এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। তাঁর নিজস্ব বাড়ি নেই; তিনি শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। পুলিশ আরও জানিয়েছে, তিনি নেশাগ্রস্ত।
গলায় গামছা, শ্বাসরোধে হত্যার সন্দেহ
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ জানান, বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে। তার শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধে হত্যার ধারণা করা হচ্ছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রয়োজন।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, তদন্ত এখনো চলছে। গ্রেফতার সুমনকে কুমিল্লায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। হত্যার সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
একজনই কি জড়িত, তদন্তে খতিয়ে দেখছে পুলিশ
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশ তদন্ত করছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে শনিবার সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে।
তাজমিনের মৃত্যুর আগে মায়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথন, মেয়ের বন্ধুত্ব নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ এবং অটোরিকশায় তার যাতায়াত—সবকিছুই তদন্তের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এসব তথ্যের মধ্যে কোনটির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, তা এখনো প্রমাণিত নয়।
মেয়েকে নিয়ে এত সতর্ক থাকার পরও কেন এমন পরিণতি হলো, কী কারণে তাজমিনকে হত্যা করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় আর কেউ জড়িত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। শোকাহত পরিবার ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।

















