জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার জাফরপুর রেলস্টেশন একসময় ছিল আশপাশের গ্রামের মানুষের যাতায়াত ও জীবিকার অন্যতম কেন্দ্র। ট্রেনের অপেক্ষায় যাত্রীদের ভিড়, স্টেশন ঘিরে হোটেল ও দোকানপাটের ব্যস্ততা আর মানুষের কোলাহলে মুখর থাকত পুরো এলাকা। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। আগের মতো যাত্রী চলাচল নেই, কমেছে ব্যবসা-বাণিজ্যও। একসময়ের কর্মচঞ্চল স্টেশনটি এখন অনেকটাই নীরব। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন স্টেশনকেন্দ্রিক ছোট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাও।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ট্রেনের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং সঠিক সময়ে ট্রেন না আসার কারণে এই স্টেশনে যাত্রী চলাচল আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। প্রয়োজনীয় যাত্রীসেবার ঘাটতি ও অবকাঠামোগত সমস্যাও তাদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। তাদের মতে, রেল যোগাযোগের সুযোগ বাড়ানো এবং স্টেশনটির পরিবেশ উন্নত করা গেলে আবারও আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসতে পারে।
জাফরপুর, রামশালা, গুনিপুর, হলহলিয়া, কাদোয়া, বিষ্ণুপুর, কাশিরা, গুডুম্বা, পলাশবাড়ী ও হাজরাপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষের যাতায়াতে একসময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত এই স্টেশন। কম খরচে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধার পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্যও রেলপথ ছিল পণ্য পরিবহনের সহজ মাধ্যম।
সংবাদ প্রকাশের জেরে আমার দেশ প্রতিনিধির বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

জাফরপুর রেলস্টেশনকে কেন্দ্র করে একসময় গড়ে উঠেছিল হোটেল, খাবারের দোকানসহ ছোটখাটো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ট্রেনের যাত্রীদের ঘিরেই এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা চলত। কিন্তু যাত্রী চলাচল কমে যাওয়ায় ব্যবসার পরিসরও সংকুচিত হয়েছে। স্টেশনের সাবেক হোটেল ব্যবসায়ী আব্দুল জলিল বলেন, “ট্রেনের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে ট্রেন না আসার কারণে যাত্রী চলাচল কমে গেছে। একসময় স্টেশনে আমার বড় হোটেল ব্যবসা ছিল। এখন সেই ব্যবসা পরিবর্তন করে অটো কিনে চালাতে হচ্ছে।” আব্দুল জলিলের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, রেলস্টেশনের কর্মচাঞ্চল্য কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু যাত্রীদের যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের জীবিকাতেও পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা তোফাজ্জল হোসেন জানান, তিনি আগে নাটোরের নলডাঙ্গা থেকে ট্রেনে করে পেঁয়াজ ও রসুন এনে স্থানীয় হাটবাজারে সরবরাহ করতেন। রেলপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা কাজে লাগিয়ে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তবে আগের মতো সেই সুযোগ এখন আর নেই। স্থানীয়দের মতে, রেলস্টেশনে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের কার্যক্রম কমে গেলে এর প্রভাব পড়ে আশপাশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও। হোটেল, দোকানপাট ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আয় কমে যায়। একই সঙ্গে সাশ্রয়ী পরিবহনের সুযোগ সীমিত হওয়ায় সাধারণ মানুষকে বিকল্প যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সময়ও বেশি লাগে।
সোনামুখী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ডি এম রাহেল ইমাম বলেন, “একসময় জাফরপুর রেলস্টেশন মানুষের ভিড় ও কোলাহলে জমজমাট ছিল। স্টেশন ঘিরে হোটেলসহ ছোটখাটো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। এখন ট্রেন ও যাত্রী চলাচল কমে যাওয়ায় সেই পুরোনো ব্যস্ততা আর নেই।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্টেশন এলাকায় প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। যাত্রীদের বসার উপযুক্ত ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলো এবং সহজে টিকিট সংগ্রহের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর স্টেশনে যাতায়াত ও ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করার পরিবেশ আরও নিরাপদ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন এলাকাবাসী। তাদের মতে, একটি রেলস্টেশন শুধু যাত্রী ওঠানামার স্থান নয়, এটি স্থানীয় যোগাযোগ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। ফলে স্টেশনটির কার্যক্রম স্বাভাবিক ও যাত্রীবান্ধব করা গেলে আশপাশের গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
এদিকে জাফরপুর রেলস্টেশনের বর্তমান অবস্থার উন্নয়নে দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের প্রত্যাশা, স্টেশনের অবকাঠামো সংস্কার, যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং ট্রেনের যাত্রাবিরতি ও সময়সূচির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীদের সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে রেল যোগাযোগের কার্যকারিতা বাড়ানো প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন মানুষের যাতায়াতের খরচ কমবে, অন্যদিকে স্টেশনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। একসময় যে স্টেশনকে ঘিরে মানুষের যাতায়াত, জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটেছিল, সেটির বর্তমান চিত্র নিয়ে হতাশ এলাকাবাসী। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জাফরপুর রেলস্টেশনের অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও যাত্রীসেবা উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। তবেই হয়তো পুরোনো কোলাহল ফিরবে স্টেশনটিতে এবং স্বস্তি ফিরবে আশপাশের গ্রামের মানুষের যাতায়াতে।ৃ

















