
বলা হয়, শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। তাহলে কি চলমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সকলে সন্তুষ্ট? কেউ কি এই শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের প্রয়োজন অনুভব করছেন না?
অথচ বাস্তবতা বলছে, আমাদের দেশে যে যত শিক্ষিত সে তত বড় চোর। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যত বড়, যত বেশি প্রখ্যাত সেটি তত বড় চোর তৈরির কারখানা। এটা প্রমাণিত সত্য, এক্সেপশন দেখিয়ে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা বৃথা।
গত দেড় দশকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে প্রায় ১৮ লক্ষ কোটি টাকা। নিজস্ব অর্থায়নে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট স্বপ্নের পদ্মাসেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। চুরি হওয়া ১৮ লক্ষ কোটি টাকা দিয়ে নিদেনপক্ষে ৫৮টি পদ্মাসেতু নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। অর্থাৎ মাত্র ১৫ বছরে সোনার বাংলা থেকে ৫৮টি পদ্মাসেতু চুরি হয়ে গেছে। তার আগের সরকারগুলোর আমলে চুরির হিসাব নাই করলাম।
এই যে ছোট্ট একটি গরিব দেশ থেকে ১৮ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হলো, এই কাজটা কারা করলো? ব্যাটারি চালিত রিক্সাওয়ালারা? গার্মেন্ট শ্রমিকরা? নাকি কৃষকরা? শিক্ষিত ব্যক্তিরা নাকি অশিক্ষিতরা? এর একটি টাকাও নিরক্ষর অশিক্ষিত মানুষের হাতে পাচার হয় নি। সব টাকা পাচার করেছে আমাদের চলমান শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত কালারড সাহেবরা।
অশিক্ষিত বাস কন্ডাক্টরের পক্ষে ১০ টাকার ভাড়া ১২ টাকা রাখা সম্ভব, রিক্সাওয়ালার পক্ষে ২০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা রাখা সম্ভব, অশিক্ষিত কৃষকের পক্ষে এক লিটার দুধে একশ গ্রাম পানি মেশানো সম্ভব, এর বেশি নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা, দেশে-বিদেশে, নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা, শেয়ার বাজারের টাকা গায়েব করে দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে দেউলিয়া করে দেয়া, এ সবই আমাদের লেখাপড়া জানা শিক্ষিত, উচ্চ শিক্ষিত মানুষের কর্ম।
প্রশ্ন হচ্ছে, যে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ চোর, বাটপার বের হয় সে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের প্রতি কারো কোনো উদ্যোগ, উৎসাহ নেই কেন? আপনি যেকোনো সেক্টরে যত সংস্কারই করেন না কেন, সেখানে যখন একটা প্রশিক্ষিত চোর বসবে সে চুরির রাস্তা ঠিক ঠিক বের করে নিতে পারবে।
শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার কেন প্রয়োজন?
চলমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা হলো- শিক্ষা প্রতিষ্ঠনগুলোসহ বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় সততা, নৈতিকতা, পরোপকারিতা, দেশপ্রেম, আমানতদারিতা, বিশ্বস্ততার মূল্যায়ন হয় না। আত্মিক উন্নতিরও কোনো প্র্যাকটিস নেই।
ধরুন আপনি উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। সেখানে গণিতে আপনার পূর্ণমান ছিল ১০০। একইভাবে পদার্থবিজ্ঞানে ১০০, রসায়নে ১০০, জীববিজ্ঞানে ১০০ ইত্যাদি। এবার বলুন, সততার ব্যাপারে কত নাম্বার ছিল? দেশপ্রেমে আপনাকে কত দেয়া হয়েছিল? আমানতদারিতা, বিশ্বস্ততার জন্য এইচএসসিতে আপনি কত পেয়েছিলেন? নিঃসন্দেহে এসব বিষয়ে আপনাকে-আমাকে কোনো নাম্বার দেয়া হয় নি, মূল্যায়ন করা হয় নি। মূল্যায়ন করা হয়েছে আপনার-আমার মেধাকে, সততাকে নয়, মনুষ্যত্বকে নয়।
এবার বলুন, যখন কোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়, পুলিশ বা সেনাবাহিনীর চাকরি, কিংবা বিসিএস পরীক্ষায় ধাপে ধাপে প্রতিযোগীদেরকে মূল্যায়ন করা হয়, তখন সেই সততা, দেশপ্রেম, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারিতা, পরোপকারিতা, এসবের কোন্ বিষয়টি যাচাই করে কত নাম্বার দেয়া হয়? এখানেও এসব ব্যাপারে চাকরিপ্রত্যাশীদেরকে মূল্যায়নের কোনো অপশন নেই। চাকরির বাজারে এগুলো অপ্রাসঙ্গিক। পক্ষান্তরে আমরা দেখি, ঘুষ বাণিজ্য ও প্রশ্ন ফাঁসের মহোৎসব।
এর ফলাফল কি হচ্ছে? সবাই শিক্ষিত হচ্ছে, কিন্তু মানুষ হচ্ছে না। মানুষ হয়ে কী লাভ, মানুষের তো কদর নেই। কদর আছে সার্টিফিকেটের, পুঁথিগত বিদ্যার, সম্পদের আর ক্ষমতার।
সৎ লোক যখন উৎপাদন হচ্ছে না তখন অন্তত মেধাবীদের অগ্রাধিকার পাবার কথা। কিন্তু ঘুষ বাণিজ্য আর প্রশ্ন ফাঁসের মতো নানা দুর্নীতির কারণে সেই মেধাবীরাও বঞ্চিত হচ্ছে। এক কোটার মাধ্যমে যে বৈষম্য করে রাখা হয়েছিল তার ফল আমরা দেখেছি, প্রতিক্রিয়াও দেখেছি। এত রক্তের বিনিময়ে এখন রাষ্ট্রসংস্কারের যে সুযোগটা পাওয়া গেছে একে যদি কাজে লাগানো না যায় তাহলে সবই বৃথা।
পড়াশোনা করে যে গাড়িঘোড়ায় চড়ে সে:
ছোটবেলায় আমাদের পড়ানো হয়- পড়াশোনা করে যে গাড়িঘোড়ায় চড়ে সে। পড়াশোনার উদ্দেশ্য যেন, গাড়িঘোড়ায় চড়া। এই বাক্যটি ভোগবাদী দর্শন থেকে উদ্ভূত, আত্মকেন্দ্রিক মস্তিষ্কপ্রসূত। শিক্ষাজীবনের শুরুতে মস্তিষ্কের নরম উর্বর জমিতে এই বীজটি বপন করে দেওয়া হয়। হৃদয়ে ইনস্টল করে দেওয়া হয় একটি ভোগবাদী জীবনদর্শন।
ফলশ্রুতিতে একটি প্রচণ্ড আত্মকেন্দ্রক চিন্তাভাবনা নিয়ে আমরা স্কুল থেকে কলেজ, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছি। জীবনে টাকা পয়সা কামাতে হলে পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই, ভালো সরকারি চাকরি পেতে হলে প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে, চাকরির বাজারে যে প্রতিযোগিতা তাতে ভালো রেজাল্ট করতে না পারলে পড়াশোনার কোনো দাম নেই, এত পড়াশোনা করে কি হবে যদি শেষ পর্যন্ত চাকরিই না জোটে- ঘুরেফিরে আমাদের সবার কাছে এগুলো পড়ালেখার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। আপনি ধনী পরিবারের সন্তান হোন, আর কৃষকের সন্তান হোন, তুখোড় মেধাবী হোন আর কম মেধাবী হোন, পড়াশুনার ক্ষেত্রে আপনার অনুপ্রেরণার জায়গায় ওই একটি বিষয়, ভালো রেজাল্ট, অতঃপর ভালো চাকরি, অতঃপর ভালো কামাই, অতঃপর সেই গাড়িঘোড়া অর্থাৎ ভোগবাদী জীবনযাপন।
আমার নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে একটি ঘটনা শেয়ার করছি। আমি তখন নবম শ্রেণিতে পড়ি। আমার স্কুলের ক্যামিস্ট্রি শিক্ষককে ক্লাসে প্রায়ই বলতে শুনলাম, ভালো রেজাল্ট করো তাইলে ভালো চাকরি পাবে এবং সুন্দরী বউ পাবে। টার্গেটটাই ভিন্ন। লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই ভিন্ন। শিক্ষার্থীরা গাড়িঘোড়া, সুন্দরী বউ কিংবা ভালো হাজবেন্ড এর লোভে ভালো রেজাল্ট করতে মরিয়া হয়ে পড়াশোনা করে। দেশ-জাতি-মানুষের সেবা মস্কিষ্কের এক কোণায় কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
রেজাল্ট ভালো না হলে বিকল্প পথ:
অনেকে ভালো চাকরির জন্য যখন নিজের মেধার উপর ভরসা করতে পারছেন না তখন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি ভাড়া করছেন, মামু-খালুদের দ্বারস্থ হচ্ছেন, অনেকক্ষেত্রেই মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে একটি চাকরির ব্যবস্থা করছেন। আবার আপনার মেধা যতই ধারালো হোক, লাভ নেই। কারণ পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। সেখানে চলছে লক্ষ লক্ষ টাকার বাণিজ্য। আমাদের শিক্ষিত কর্মকর্তারা এভাবেই একটা সিস্টেম গ্রো করেছে যার ফল পুরো জাতি ভোগ করছে।
প্রত্যেক শিক্ষার্থী একেকটি ইনভেস্টমেন্ট:
প্রাইভেট আর কোচিং বাণিজ্য দেখলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যে একেকটি আপাদমস্তক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। আর প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলার অপেক্ষাই রাখে না। অভিভাবরা এটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। পড়াশোনা করাতে গিয়ে অনেককে জমিজমাও বিক্রি করতে হয়। তাছাড়া অন্যান্য সকল পণ্যদ্রব্যের সাথে শিক্ষা উপকরণগুলোর মূল্যও সমান তালে বৃদ্ধি পায়। ভ্যাট, ট্যাক্সেও ছাড় নেই। এই ব্যয়বহুল শিক্ষাব্যবস্থায় একেকটি শিক্ষার্থী যেন ফ্যামিলির ইনভেস্টমেন্ট। শিক্ষার্থীদের উপরে তার ফ্যামিলি ইনভেস্ট করেন। উদ্দেশ্য হলো, পড়াশোনা শেষে ভালো চাকরি করে যেন তাদের ভালো রাখতে পারে। দুই যুগের করা ঋণ শোধ করতে পারে। অবশ্যই সন্তান বৃদ্ধ বয়সে তার বাবা-মা কে দেখবে। কিন্তু ইনটেনশটাই যদি এমন হয় তাহলে তো বিপদ আছে।
এজন্যই পড়াশোনা শেষে চাকরির অভাবে এত হাহাকার শিক্ষার্থীদের। চাকরির পেছনে ঘুরতে ঘুরতে তাদের মাথা ঠিক থাকে না। এত এত কষ্ট, সংগ্রাম, ইনভেস্টমেন্টের পর আর কতকাল বাবা-মায়ের বোঝা হয়ে থাকবে! দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে হলেও একটি চাকরি চাই-ই চাই। হোক সেটা ঘুষ কিংবা প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে। ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায় ‘নিজে বাঁচলে জাতির নাম’ টাইপ।
বেতন কম হলে দুর্নীতির আশ্রয়:
এত ইনভেস্ট, এত প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘ ২০-৩০ বছরের সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে যখন একটি চাকরি হয় তখন সর্বাগ্রে আসে ভালো কামাইয়ের বিষয়টি। আর ভালো কামাইয়ের প্রশ্নে এসে যখন নীতি আর দুর্নীতি, সততা আর অসততা সামনে দাঁড়িয়ে যায়, তখন সততা, নীতি, দেশপ্রেম অতীত ইনভেস্টমেন্ট এবং ভোগবাদী দর্শনের কাছে পরাস্থ হয়। যারা ঘুষ কিংবা দুর্নীতি করে চাকরি নিচ্ছেন তাদের কথা বলাই বাহুল্য। আর যারা জমি-জমা বিক্রি করে সর্বশান্ত হয়েছেন তাদের জন্য যেন এটা জায়েজ। আর ছোটবেলায় মস্তিষ্কে রোপিত গাড়ি-বাড়ি গড়ার সেই গাছটিও ততদিনে বিশাল বটবৃক্ষ হয়ে যায়।
এজন্যই দেখা যায়, কর্মজীবনে নীতি-নৈতিকতা সমস্ত কিছু ছুঁড়ে ফেলে আগে নিজের স্বার্থটা রক্ষা করে চলে সকলে। শুরু হয় চুরির প্রতিযোগিতা। যার যার পজিশন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, মেধা ও সামর্থ্য মোতাবেক জাতির অর্থ চুরি, লুটপাটে নামে। ফলাফল ৬ বার দুনীতিতে চ্যাম্পিয়ন দেশ।
অনেকে অবশ্য এর জন্য রাজনৈতিক সিস্টেমকে দায়ী করেন। হ্যাঁ এর দায়ভার রাজনৈতিক সিস্টেমের উপরেও কিছুটা বর্তায় তবে তা শিক্ষাব্যবস্থার অসঙ্গতি-দুর্বলতাকে মোটেও ম্লান করে না। কারণ এই শিক্ষিত লোকগুলোই রাজনীতি করছেন। যেখানে আমলা থেকে শুরু করে কেরানী পর্যন্ত স্বল্প শিক্ষিত আর মহা শিক্ষিত সবাই লোভী, সবাই ভোগবাদী সেখানে দুর্নীতি হবে না এটা আশা করা গাধামি। এরা সরকার কিংবা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কোনো দুর্নীতির প্রতিবাদ তো করেই না, বরং চুরিতে, দুর্নীতিতে রাজনৈতিক মদদপুষ্টতা পেতে প্রতিযোগিতায় নামে। আর তাদের মধ্যে স্বল্প সংখ্যক যারা ভালো থাকতে চায় তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে, হারিয়ে যায়।
গলদ কোথায়?
গোড়ার কারণটি জানতে ইতিহাসের দিকে একটু নজর দিতে হবে। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষকে যখন সামরিকভাবে পদানত করল তারা এই জনগোষ্ঠীকে চিরস্থায়ীভাবে তাদের দাসে পরিণত করার জন্য নানমুখি ষড়যন্ত্রে নামল। তার মধ্যে অন্যতম হলো একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করা। দায়িত্ব দেওয়া হলো- ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ লর্ড মেকলে কে। তিনি ভারতবর্ষ ঘুরে সার্বিক পরিস্থিতি পযবেক্ষণপূর্বক ১৮৩৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একটি লিখিত প্রস্তাব তুলে ধরেন।
লর্ড মোকলে তার সেই প্রস্তাবনায় লিখেন- ‘আমি ভারতের এ মাথা থেকে ও মাথা ঘুরে বেড়িয়েছি, কিন্তু একটি ভিক্ষুকও আমার চোখে পরে নি, একটা চোরও আমি দেখতে পাই নি। এ দেশে সম্পদের এত প্রাচুর্য এবং এদেশের মানুষগুলো এতটাই যোগ্যতাসম্পন্ন ও উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী যে, এদেশকে আমরা কখনোই পদানত করতে পারবো না, যদি না আমরা তাদের মেরুদণ্ডটি ভেঙে ফেলতে পারি। এদেশের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই হচ্ছে সেই মেরুদণ্ড। এ কারণে আমার প্রস্তাব হচ্ছে, আমরা এখানকার প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কৃতিকে এমন একটি শিক্ষা ও সংস্কৃতি দিয়ে প্রতিস্থাপন করবো, যাতে প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিক ভাবতে শেখে, যা কিছু বিদেশি অর্থাৎ ইংরেজদের তৈরি, তা-ই ভালো এবং নিজেদের দেশের চেয়ে উত্তম। এভাবে তারা নিজেদের প্রতি শ্রদ্ধা হারাবে, দেশীয় সংস্কৃতি বিলুপ্ত হবে এবং তারা এমন একটি দাস জাতিতে পরিণত হবে ঠিক যেমনটা আমরা চাই।’
লর্ড মেকলের পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাবনা বিবেচনাপূর্বক ষড়যন্ত্রে নকশা আঁকতে বসে পড়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। একদল ঘাঘু ওরিয়েন্টালিস্টদের নিয়ে গাঢ় নীল নকশা অঙ্কন করল। এই জনগোষ্ঠীকে চিরস্থায়ীভাবে তাদের দাসে পরিণত করার জন্য দুই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালুর চক্রান্ত করল তারা। একটি হল মাদ্রাসা শিক্ষা, আরেকটি সাধারণ শিক্ষা।
মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা:
১৭৮০ সালে কলকাতায় লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠান করেন। মাদ্রাসার সিলেবাস কারিকুলাম খ্রিষ্টান পণ্ডিতরাই তৈরি করে দেন। টানা ৭৬ বছর ধরে ২৭ জন খ্রিষ্টান পণ্ডিত এই মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল পদে থেকে মুসলমানদেরকে ‘ইসলাম’ শিক্ষা দিয়েছেন। ১৪৬ বছর তারা নিজেদের মতো করে মাদ্রাসা পরিচালনা করেছেন। এটা বুঝতে খুব বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন পড়ে না যে, তারা যেটা শিখিয়েছেন সেটা আল্লাহ রসুলের প্রকৃত ইসলাম ছিল না। সেটা কী ধরনের ‘ইসলাম’ ছিল তা জানতে মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী রচিত ‘ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্রমূলক শিক্ষাব্যবস্থা’ বইটি পড়তে পারেন।
ব্রিটিশদের তৈরি মাদ্রাসায় সবচেয়ে বড় যে বিকৃতি ছিল সেটা হচ্ছে, এই মাদ্রাসায় জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য কোনো প্রকার কর্মমুখী শিক্ষা দেওয়া হল না। শুধু মাসলা-মাসায়েল দিয়ে তো সংসার চলে না। ফলে ঐ মাদ্রাসা থেকে শিক্ষিতরা ধর্মকেই তাদের জীবন জীবিকার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করতে বাধ্য হল। আজও সেই ব্যবস্থা চালু আছে। মাদ্রাসা থেকে যারা পড়াশুনা করে বেরিয়ে আসছেন তাদের কর্মসংস্থানের জন্য আজও তেমন কোনো কার্যকর বন্দোবস্ত হয়নি। সেক্যুলার সরকারগুলো নানা সময়ে তাদেরকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিলেও মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরে তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো উপায় সৃষ্টি হয়নি। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রধান চার ধরনের মাদ্রাসা রয়েছে- কওমি, আলিয়া, ফোরকানিয়া, নুরানি। এর বাইরেও বিভিন্ন মাজহাব ফেরকা বা তরিকার নিজস্ব মাদ্রাসা রয়েছে যেমন হাফিজিয়া মাদ্রাসা, আহালে হাদিস মাদ্রাসা, ছারছিনা মাদ্রাসা ইত্যাদি। এই মাদ্রাসাগুলির আমল, আকিদা, চিন্তা চেতনা, শিক্ষা পদ্ধতি একেক রকম। এদের কারো মতের সাথে আদর্শের সাথে কারো মিল নেই। একেক মাদ্রাসা পড়ুয়াদের জগত একেক রকম।
সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা:
একইভাবে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেও মাদ্রাসার মত বহুরকম বিভক্তি রয়েছে। যেমন- বাংলা মিডিয়াম, ইংলিশ মিডিয়াম, ইংলিশ ভার্সন, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, পাবলিক ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি। ইংলিশ মিডিয়ামের সিলেবাস কারিকুলাম তৈরি করা হয় ইউরোপের স্কুলগুলোর অনুকরণে। এই সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াও সেই ঔপনিবেশিক যুগে। তখন প্রশাসনিক দপ্তরগুলোতে উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের ফাইফরমাস খাটার জন্য, তাদের কেরানি ও দোভাষীর কাজ করার জন্য একদল দেশীয় লোককে ইংরেজি ভাষাসহ ইতিহাস, ভূগোল, গণিত ইত্যাদি বিষয়গুলো শেখাতে তারা এই সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল। এখানে যে সর্বনাশটা তারা করেছে তা হল, এই শিক্ষাব্যবস্থার সিলেবাসে ধর্মকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। কেবল তা-ই নয়, এখানে ধর্মের ব্যাপারে সন্দেহ, অবজ্ঞা, হীনম্মন্যতা ও বিদ্বেষের ভাব ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর পাশ্চাত্যের সবকিছুই শ্রেষ্ঠ, সর্বোত্তম এমন একটা ধারণা প্রদান করা হয়েছে। সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের তারাই আবিষ্কর্তা এমন ইতিহাস শেখানো হয়েছে। তারা যখন ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যায় তখন এই শিক্ষিত শ্রেণিটির হাতে জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা তুলে দিয়ে যায়, যে শিক্ষিত গোষ্ঠীটি চামড়ার রঙে ভারতীয় হলেও মনে মগজে, চিন্তা ভাবনায় খাঁটি ইংরেজ। ফল দাঁড়িয়েছে এটাই- আমাদের ধর্মীয় অঙ্গনে নেতৃত্ব দিচ্ছে ব্রিটিশদের তৈরি ইসলামে শিক্ষিতরা। আর জাতীয় জীবনে নেতৃত্ব দিচ্ছে পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতার সৃষ্ট বিভিন্ন তন্ত্র ও মতবাদের পূজারীরা। এভাবে আমরা এখনও পরোক্ষভাবে ঔপনিবেশিক প্রভুদেরই দাসত্ব করে যাচ্ছি।
এইভাবে আমাদের বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থার ফলে শিক্ষিত সমাজ তাদের জীবনের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য খুঁজে পাচ্ছে না। তারা মনস্তাত্ত্বিকভাবে বহুধাবিভক্ত এবং তাদের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়ারা মনে করছে মাদ্রাসা শিক্ষিতরা কট্টরপন্থী, কূপমণ্ডূক। আর মাদ্রাসাশিক্ষিতরা মনে করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হল অনৈসলামিক ক্রিয়াকলাপের আখড়া। মাদ্রাসায় দীনের প্রকৃত মর্মবাণী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না, দেওয়া হচ্ছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে মতবিরোধ। আর সাধারণ শিক্ষার মধ্যে ধর্মের কোনো শিক্ষাই দেওয়া হচ্ছে না। আল্লাহ-রসুল, পরকাল, নৈতিকতা বা তাকওয়া ইত্যাদি শিক্ষা নেই এখানে। এখানে সম্পূর্ণ বস্তুবাদী পশ্চিমাদের ধ্যান-ধারণা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। ফলে এখান থেকে বের হচ্ছে সম্পূর্ণ দুনিয়ামুখী বস্তুবাদী একদল লোক। এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সবাই সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, অর্থপাচার, অপরাজনীতি ইত্যাদির সাথে সম্পৃক্ত। অন্যদিকে মাদ্রাসা থেকে যে জনগোষ্ঠীটি বের হচ্ছে তারা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, ভূগোল, গবেষণা, কারিগরি শিক্ষা, রাষ্ট্র পরিচালনা ইত্যাদি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। জীবন ধারণের জন্য তারা ধর্মকেই জীবিকা হিসাবে গ্রহণ করছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী রচিত ‘ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্রমূলক শিক্ষাব্যবস্থা’ বইটি পড়তে পারেন।
যাই হোক, কথা হচ্ছে- ব্রিটিশরা যা চেয়েছে তাই করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের প্রবর্তিত শিক্ষব্যবস্থার দ্বারা আমাদের হীনম্মন্য, দাস জাতিতে পরিণত করেছে। শিক্ষিতের নামে একদল কেরানি তৈরি করে তাদের দাপ্তরিক কাজ চালিয়েছে। তাদের অপসংস্কৃতির আগ্রাসনের মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতি ধ্বংস করেছে।
আক্ষেপের বিষয় হলো- তাদের রেখে যাওয়া সেই দাস আর কেরানি তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা আমরা এখনো চালু রেখেছি। এখনো বিশ্বস্ততার সাথে তাদের দাসত্ব করে যাচ্ছি। তারা জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে খান খান করে দিয়ে গেছে। এখনো তাদের প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখায় টুকরো টুকরো হওয়া হাড়গুলোতে পচন ধরেছে। পুরো জাতিটা অমেরুদণ্ডী প্রাণিতে পরিণত হয়েছে। এখন আমরা মেরুদণ্ডহীন প্রাণী কেচোর মতো করে বুকে হেঁটে আগানোর চেষ্টা করছি।
করণীয়:
এই বহুমুখি শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। যেখানে একই প্রতিষ্ঠানে এক সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যেমন শিক্ষা দেয়া হবে, কর্মমুখী জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে যেমন হাতে কলমে শেখানো হবে, ঠিক তেমনি ধর্মের সঠিক আদর্শ ও ইতিহাস তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের আত্মিক পরিশুদ্ধির ব্যবস্থাও রাখতে হবে। একজন শিক্ষার্থী আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করার যোগ্যতা যেমন অর্জন করবে, ঠিক তেমনি আত্মিকভাবেও সে পরিশুদ্ধ হয়ে উঠবে যেন সে তার মেধা ও যোগ্যতাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার না করে বরং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে কাজে লাগায়।
যে শিক্ষাব্যবস্থায় একজন শিক্ষিত লোক মো’মেন হবে, দেশপ্রেমিক হবে এবং মানবতার কল্যাণকামী হবে। একদিকে সে অত্যন্ত সাহসী হবে আর একদিকে সে মানবদরদী হবে। জীবন গেলেও, না খেয়ে থাকলেও সে ঘুষ খাবে না, মৃত্যুর হুমকি আসলেও অর্থপাচার করবে না, দেশের বা মানুষের ক্ষতি হয় এমন কিছু করবে না এমন মহানুভব শিক্ষিত লোক তৈরি হবে।
যে শিক্ষাব্যবস্থা একটা জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে খান খান করে দিয়েছে সেই শিক্ষাব্যবস্থার কেবল সংস্কার নয় আমূল পরিবর্তনের এখনই সময়। সময় গেলে সাধন হবে না।
[লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। যোগাযোগ: ০১৮৫২১৮০৯০৬]
চলমান শিক্ষাব্যবস্থা জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে -ওবায়দুল হক বাদল
বজ্রশক্তি ডেস্ক

















