একটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী; যারা সাধারণ মানুষের রক্ষাকবচ, তারা নিজেরাই যখন সমাজে নিরাপদ নয় তখন সেই রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তা অবস্থা কেমন তা সহজেই অনুমান করা যায়। সাধারণ মানুষের রক্ষকরাই যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নাজুক তা ব্যাখ্যা করার অপেক্ষা রাখে না।
সমাজে অপরাধীর সংখ্যা যেমন দিন বাড়ছে তেমনি অপরাধের সংখ্যাও। চুরি, ছিনতাই, হত্যা, খুন, ধর্ষণ, শিশু পাচারসহ প্রায় সকল অপরাধ পূর্বের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আইন, আদালত, মোটিভেশন, ওয়াজ মাহফিল কোনো কিছুই অপরাধের লাগাম টেনে ধরতে পারছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চেষ্টা চালিয়ে গেলেও তারাও ব্যর্থ। মানুষ দিন দিন অত্যধিক অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। অপরাধীরা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, আইন কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাউকেই তোয়াক্কা করছে না। তাদের হাত থেকে সাধারণ মানুষ তো নিরাপদ নয়ই ইদানিং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রূপসা থানায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা শেষে ফেরি পার হয়ে ফেরার পথে তাঁদের এক পুলিশ পরিদর্শক ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হন। তিনি রিকশায় করে বাসায় ফিরছিলেন। তাঁর কাছে দুটি মুঠোফোন ও একটি ওয়ালেট ছিল। খুলনা কলেজিয়েট গার্লস স্কুলের সামনে তিনি ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। হয়তো এ সময় তিনি প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি সাদাপোশাকে ছিলেন। মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তিনি এখনো ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
রসুল (সা.) ছিলেন সত্যের মূর্তপ্রতীক, নায়েবে নবী দাবিদারদের চরিত্রের এ কি দশা! -ওবায়দুল হক বাদল

এ ঘটনার পর খুলনায় পুলিশ সদস্যদের রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাতে জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) পুলিশ সুপার স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেয় খুলনা জেলা পুলিশ।
নির্দেশনাপত্রে বলা হয়েছে, চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জেলার রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চলছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাও পরিলক্ষিত হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষ অভিযানসহ অন্যান্য দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশ দেওয়া হলো। এ বিষয়ে ইউনিট ইনচার্জদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
এই হলো আমাদের সমাজ। এই হলো আমাদের রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার চিত্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যে সমাজে নিরাপদ নয় সেখানে সাধারণ মানুষের অনিরাপত্তা কতটা তা অনুমেয়। আর সেই সমাজের নারীরা কতটা অনিরাপদ তা বলাই বাহুল্য।
১৪০০ বছর আগে আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগটিও ছিল এমন চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি ছিল মানুষের এক প্রকার বৈধ পেশা। আজ আমাদের সমাজের দিকে তাকালে সেই সমাজের চিত্রই ভেসে ওঠে। অপরাধ সংঘটিত হতে হতে তা এমনভাবে সমাজে স্থান করে নিয়েছে যেন তা পেশায় পরিণত হয়েছে।
আইয়্যামে জাহেলিয়াতও ছিল একটি অনিরাপদ। সেই সমাজে কারোরই নিরাপত্তা ছিল না। নারীদের তো নয়ই। রসুল (সা.) সেই জাহেলিয়াতকে পরিবর্তন করে এমন এক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়েছেন, যে সমাজে একা একজন নারী রাতের আঁধারে শত শত মাইল পাড়ি দিতে পারত, তার মনে নিরাপত্তাহীনতার কোনো জায়গাই ছিল না। আর সেই সমাজে পুলিশেরও কোনো প্রয়োজন ছিল না।
নিরাপত্তা বিষয়ে রসুলাল্লাহর (সা.) জীবনের অজস্র ঘটনা থেকে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি।
ঘটনাটি হচ্ছে এমন: একদিন আল্লাহর রসুল (সা.) কা’বা শরীফের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। সময়টা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তিনি ও তাঁর সাহাবীগণের (রা.) ওপর প্রচণ্ড বাধা এবং অবর্ণনীয় নির্যাতন নিপীড়ন চলছিল। এমন সময় একজন সাহাবা, খাব্বাব (রা.) তাঁকে বললেন, ‘হে আল্লাহর রসুল! এই অত্যাচার নিপীড়ন আর সহ্য হচ্ছে না। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন আমাদের বিরোধীরা সব যেন ধ্বংস হয়ে যায়।’ কথাটাকে আল্লাহর রসুল যথেষ্ট গুরুত্ব দিলেন। তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং ঐ সাহাবাকে বললেন, ‘তুমি কী বললে?’
‘ইয়া রসুলাল্লাহ! এত নির্যাতন নিপীড়ন আর সহ্য হচ্ছে না। আপনি বরং ওদের ধ্বংস হবার দোয়া করে দিন।’ – খাব্বাব (রা.) তার কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। কিন্তু আল্লাহর রসুল খাব্বাবের অনুরোধ শুনে ধ্বংসের দোয়া করলেন না। তিনি বললেন, ‘শোন, শীঘ্রই সময় আসছে যখন কোনো যুবতী মেয়ে গায়ে গহনা পরে একা সা’না থেকে হাদরামাউত যাবে। তার মনে এক আল্লাহ এবং বন্য জন্তু ছাড়া আর কোন ভয় থাকবে না।’ [খাব্বাব (রা.) থেকে বোখারী ও মেশকাত]।
এই হাদীসটি থেকেই আমরা ইসলামের উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে জানতে পারি। প্রথমত, আল্লাহর রসুল উদাহরণস্বরূপ বললেন- মেয়ে লোক, কোনো পুরুষের কথা বললেন না। কারণ নারীদের প্রাণ ও সম্পদ ছাড়াও আরও একটি জিনিস হারাবার সম্ভাবনা আছে যা পুরুষের নেই। সেটা হল ইজ্জত, সতীত্ব, সম্ভ্রম। দ্বিতীয়ত, ঐ নারী বয়সে যুবতী। অর্থাৎ লোভাতুরদের কাছে আরও লোভনীয়। তৃতীয়ত, অলঙ্কার গহনা পরিহিত, চোর ডাকাতের জন্য লোভনীয়।
এতগুলো লোভনীয় বিষয় থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর রসুল (সা.) বলছেন, অনুরূপ একটি অলঙ্কার পরিহিত যুবতী নারী একা সা’না শহর থেকে প্রায় সাড়ে ছয়শো কিলোমিটার দূরবর্তী হাদরামাউতে যেতে পারবে, যা অন্তত কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার, এত দীর্ঘ পথে তার ধনসম্পদ বা ইজ্জত হারানোর কোনো আশঙ্কা থাকবে না। সেই নারী কোন ধর্মের বা গোত্রের তারও উল্লেখ রসুল করেননি। অর্থাৎ, সব ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের নারীর জন্যই এই অভাবনীয় নিরাপত্তাটি কায়েম হবে।
আর এটি কেবল সম্ভব প্রকৃত ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই। কারণ ইসলামের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন সমাজব্যবস্থা কায়েম করা যেখানে কোনো হিংসাত্মক ঘটনা ঘটবে না, কোনো ভয়ভীতি, আতঙ্ক থাকবে না, নিরাপত্তাহীনতা থাকবে না। আর আল্লাহর হুকুম তওহীদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আল্লাহর রসুল (সা.) সেই সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষী রসুলাল্লাহর (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা হয়নি। বাস্তবেই তেমন একটি শান্তিময় ও নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল (আদি ইবনে হাতেম (রা.) থেকে বোখারি, হাদিস নং ৩৫৯৫)।
পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ মো’মেনদেরকে এমন একটি সমাজেরই ওয়াদা করেছেন। তিনি বলেছেন, সেখানে তিনি মো’মেনদেরকে শাসনকর্তৃত্ব (খেলাফত) দান করবেন, সেখানে আল্লাহর পছন্দের জীবনব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করবেন এবং তাদেরকে ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই নিরাপত্তা (আমান) দান করবেন (সুরা নুর ২৪:৫৫)।

















