মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবিক সংকট। এই অঞ্চলে দশকের পর দশক ধরে সংঘাত ও যুদ্ধ চলমান। কখনো ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ফিলিস্তিন, আবার কখনো ইয়েমেন। একেকটি দেশ যেন একেক সময় যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে। এর বাইরে ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানেও বিভিন্ন সময়ে সংঘাত ও সহিংসতা দেখা যাচ্ছে। লক্ষ করলে দেখা যায়, বারবার যুদ্ধ ও সংঘাতের কেন্দ্রে উঠে আসছে নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ। এসব দেশের মধ্যে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমত, এসব দেশের অনেকগুলোতেই রয়েছে বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ। দ্বিতীয়ত, এসব দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী মুসলিম। তৃতীয়ত, দেশগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত; যা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর স্বার্থের জন্য লোভনীয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এরপর থেকে এই অঞ্চলে একের পর এক যুদ্ধ ও সংঘাত চলেই আসছে। এই দীর্ঘ সংঘাতের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ নতুন করে আলোচনায় এসেছে নতুন করে বাধা সৌদি-হুতি সংঘাত।
গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবে এত বড় হামলার ঘটনা আর ঘটেনি। ফলে দীর্ঘদিনের সৌদি-হুতি সংঘাত আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি হামলা-প্রতিহামলা।
এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতে হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র ত্রিমুখী স্থল ও নৌ অভিযান চালায়। তারা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা (গড়শযধ) এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি খালিদ ইবনে আল-ওয়ালিদ ক্যাম্প দখল করে নেয়। মোখা বন্দর দখলের পর হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ ময়উন দ্বীপ (চবৎরস ওংষধহফ) দখল করে। এর পাশাপাশি লোহিত সাগরের হানিশ ও জুকার দ্বীপপুঞ্জও চলে যায় হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয় হুতিদের সামনে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় নিলে এসব সংঘাতের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই প্রণালি আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। ফলে ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণের লড়াই স্থানীয় সামরিক সংঘর্ষের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে।
পরবর্তীতে অক্টোবরের শুরুতে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী সৌদি জোটের বিমান সহায়তায় প্রণালিটি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ‘অপারেশন ইয়েমেনস ডন’ নামে একটি বড় ধরনের পাল্টা অভিযান শুরু করে। হুতিদের প্রতিহত করতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলা আরও তীব্র করা হয়। অভিযানে সৌদি জোটের প্রায় ১০০টি যুদ্ধবিমান অংশ নেয়। সরকারি বাহিনী মোখা ও বাব আল-মান্দেবসহ উপকূলীয় অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে। এই পাল্টা অভিযানে প্রায় ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি হুতি যোদ্ধা নিহত এবং ৪৬০টিরও বেশি সামরিক যান ও সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে বলে জানা যায়।
পিছু হটার পর হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের অভ্যন্তরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করে। তাদের ছোঁড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইল সৌদি রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আঘাত হানে। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৭ থেকে ১১ অক্টোবরের মধ্যে বিমানবন্দরটিতে ধারাবাহিক হামলায় মোট ১৭ জন নিহত হন এবং আহত হন তিন শতাধিকের বেশি মানুষ। এসব হামলায় দুই বাংলাদেশি প্রবাসীও নিহত হন। আহত হন আরও ২৪ বাংলাদেশি।
হামলার পর নিরাপত্তার স্বার্থে রিয়াদের সব স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে অনলাইন ক্লাস চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া সৌদি আরবের জাজান ও নাজরান বিমানবন্দর এবং রাবিগ শোধনাগারেও হুতিরা হামলা করে। ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনে অবস্থিত আল-মাআশিক প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস লক্ষ্য করেও একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুতিরা। এতে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দুই দেহরক্ষী নিহত হন।
হুতিদের ধারাবাহিক হামলা প্রতিহত করার লক্ষ্যে রিয়াদে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সামরিক সহায়তা ও প্রতিরোধব্যবস্থা সক্রিয় করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় পাকিস্তান ইতোমধ্যে সৌদি আরবে সেনা মোতায়েনে সম্মত হয়েছে। তবে এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এ বিষয়ে পার্লামেন্টের অনুমোদন উপেক্ষা করেছেন।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনাপ্রবাহ থেকেই এটি স্পষ্ট যে, এই সংঘাত প্রথমে উল্লেখ করা কয়েকটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই সামরিক জোট, সংঘাত, যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণে এখন আমেরিকা কিংবা রাশিয়ার প্রত্যক্ষ উপস্থিতি কমে আসছে। একদিকে হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক। ইরানের সাথে আবার রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক। অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের তেল ও অস্ত্রের সম্পর্ক। এই বড় বড় প্রতিদ্বন্দ্বীরা সংঘাতের গুরুত্ব বাড়িয়ে, নিরাপত্তার হুমকি দেখিয়ে স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত। যদিও সব সমীকরণ একরৈখিক নয়।
কিন্তু এই ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সংঘাতের কেন্দ্রস্থলে থাকা দেশগুলোর সাধারণ মুসলমানকে। লক্ষ করলে দেখা যায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত এসব দেশের অনেকগুলোতেই রয়েছে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, অধিকাংশ জনগোষ্ঠী মুসলিম এবং দেশগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রশ্ন ওঠে, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধি, কৌশলগত অবস্থান ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও কেন এসব দেশের মানুষ বারবার যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তার শিকার হচ্ছে? নাকি এসব দেশের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে এক দীর্ঘ পরিকল্পিত দ্বন্দ্ব-সংঘাত।
বর্তমানে ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশ ও এর আশপাশের পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে হুতি যোদ্ধা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের অনুগত বাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। এসব এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে উভয় পক্ষই সর্বোচ্চ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করছে।
হুতি বিদ্রোহী এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারি জোটের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধ নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় দেশটিতে বিশ্বের অন্যতম চরম মানবিক বিপর্যয় ও সংকট তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে পাল্টাপাল্টি এই সংঘাতে কারণে ইয়েমেনে এ পর্যন্ত ২ লাখ ১ হাজার ২১৭ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডঋচ) সতর্ক করেছে যে, হুতিরা ইয়েমেনের অন্যতম বড় শহর তাইজ অবরুদ্ধ করে ফেলায় প্রায় ৮ লাখ বাসিন্দা চরম খাদ্য ও জীবনরক্ষাকারী ত্রাণ সহায়তার সংকট-এ পড়েছেন। অবরুদ্ধ থাকার কারণে সেখানে কোনো ধরনের মানবিক সাহায্য পৌঁছানো যাচ্ছে না। তুমুল যুদ্ধের কারণে হাসপাতালগুলো আহত মানুষের চাপে বড়াছে। ২০১৫ সাল থেকে চলা এই দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ও সাম্প্রতিক তীব্র সামরিক সংঘর্ষ ইয়েমেনের সাধারণ বেসামরিক জনগণকে এক সীমাহীন দুর্ভোগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
আর এদিকে,
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই যুদ্ধ থেকে লাভবান হচ্ছে কারা? অস্ত্র উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো কি সংঘাতের কারণে বাড়তি ব্যবসার সুযোগ পাচ্ছে না? রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব কি নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব আরও সুসংহত করছে না?
সামরিক ব্যয়ের দিকে তাকালেই এই সংঘাতের অর্থনৈতিক দিকটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ঝওচজও) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সৌদি আরবের সামরিক ব্যয় ছিল আনুমানিক ৮ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। বিপুল অর্থ ব্যয় করে অত্যাধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে কেন? নিরাপত্তার জন্য? যদি তাই হয়, তবে এই নিরাপত্তাহীনতা কীভাবে তৈরি হলো? গত শতাব্দীর আগে এই এলাকার মানুষ মোটামুটি বড় যুদ্ধ ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করেছে।
এখন সবশেষে প্রশ্ন হলো, কেন এই অঞ্চলে বারবার যুদ্ধ, সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা ফিরে আসে? এর পেছনে কি প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, ধর্মীয় পরিচয়, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পরাশক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ, ঔপনিবেশিক ইতিহাস, নাকি পরিকল্পিতভাবে তৈরি রাজনৈতিক সংকট দায়ী? তবে ক্ষমতা ও প্রভাবের লড়াইয়ে যে পক্ষেরই লাভ হোক না কেন, এর মূল্য দিতে হচ্ছে মুসলিম জাতিকে, সাধারণ মুসলমানকে।
সৌদি-হুতি সংঘাত: কার স্বার্থে জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য, মূল্য দিচ্ছে কারা? -হাসান মাহদী

বজ্রশক্তি ডেস্ক
















