বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধারের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও। তাহসিফের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেওয়া কেএসএম ইনতিসার ইনজামাম দাবি করেছেন, ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাহসিফ জড়িত ছিলেন এবং এ কারণে তাকে হেয় করা হয়েছিল। অন্যদিকে, মৃত্যুর তিন মাসেরও বেশি আগে প্রকাশিত এক পডকাস্টে তাহসিফ অভিযোগটির পক্ষে প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। বন্ধুর দাবি, তাহসিফের পুরোনো বক্তব্য ও তার মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠলেও এখন পর্যন্ত ভিডিও বিতর্কের সঙ্গে তার মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র কিংবা মৃত্যুর পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
মৃত্যুর পর বন্ধুর ফেসবুক পোস্টে নতুন দাবি
তাহসিফের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তার বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেওয়া কেএসএম ইনতিসার ইনজামাম (KSM Intisaar Inzimam) দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে তাহসিফের সম্পৃক্ততা ছিল। তার ভাষ্য, ভিডিওটি প্রকাশের পর তাহসিফকে বিভিন্নভাবে হেয় করা হয়েছিল।
ফেসবুক পোস্টে ইনতিসার লেখেন, ‘ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি। হাসিনার ভিডিও ভাইরাল করার সঙ্গে জড়িত এই ছেলেটার লাশ আজকে তুরাগ নদীতে ভেসে আসছে।’
প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি, টোকিওতে আটকে ফ্লাইট!

পোস্টে তিনি আরও জানান, তাহসিফ গত পরশু রাতে বাইরে যাওয়ার পর এ ঘটনা ঘটে। মরদেহের হাতে কাদা থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি মৃত্যুর কারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। ইনতিসারের দাবি, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা দুর্ঘটনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত না হলে তিনি ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বলে ধরে নেবেন।
তবে ইনতিসারের এসব বক্তব্য তার ব্যক্তিগত দাবি ও ধারণা। মরদেহের হাতে কাদা থাকার বিষয়টি মৃত্যুর ধরন সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয়, তা নির্ধারণের জন্য তদন্ত ও ফরেনসিক তথ্য প্রয়োজন। একইভাবে, তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে রাজনৈতিক কোনো কারণ রয়েছে কি না, সে বিষয়েও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বন্ধুত্ব, আদর্শের অমিল ও চাকরিজীবন নিয়ে যা বললেন ইনতিসার
নিজের পোস্টে তাহসিফের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয়ের কথাও তুলে ধরেন ইনতিসার। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আদমজী কলেজে পড়ার সময় তাহসিফের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। পরে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে তারা একসঙ্গে প্রশিক্ষণও নেন।
ইনতিসার দাবি করেন, জীবনদর্শন ও আদর্শের দিক থেকে তাদের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য থাকলেও বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার সময় তাহসিফ তার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তার বর্ণনায়, দুজনের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিগত পরিচয় ও বন্ধুত্ব বজায় ছিল।
ইনতিসারের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ভিডিও প্রকাশের পর তাহসিফকে বিভিন্নভাবে হেয় করা হয়েছিল। তাহসিফের বিরুদ্ধে পুলিশি মামলা করা সম্ভব হয়নি বলেও তিনি পোস্টে উল্লেখ করেন। এসব ঘটনার সঙ্গে ভিডিওটি প্রকাশের যোগসূত্র রয়েছে বলে নিজের বিশ্বাসের কথা জানান ইনতিসার।
তবে ভিডিও প্রকাশের কারণে তাহসিফ হয়রানির শিকার হয়েছিলেন কি না, কিংবা বিমানবাহিনী থেকে তার অব্যাহতির সঙ্গে ওই ঘটনার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বন্ধুর বক্তব্যের পাশাপাশি এসব দাবির সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
পডকাস্টে ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ নিয়ে কী বলেছিলেন তাহসিফ?
মৃত্যুর প্রায় তিন মাস আগে, গত ২১ জুলাই ‘স্পিক উইথ রশিদ’ নামের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি পডকাস্টে নিজের চাকরি, বিমানবাহিনীতে কাজের অভিজ্ঞতা এবং তাকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন সম্পর্কে কথা বলেন তাহসিফ সাউরি। তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোকে তিনি অপপ্রচার হিসেবে বর্ণনা করেন।
সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে উপস্থাপক ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিওর প্রসঙ্গ তোলেন। তাহসিফকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়ার যে অভিযোগ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চান।
জবাবে তাহসিফ বলেন, ‘ওখানে তারা ক্লিয়ারলি লিখেছে ভিডিওটি আমি ছড়িয়েছি। আমি যে শুট করেছি, এটাও তারা বলেনি। বলেছে, রিফাত আশরাফী ভিডিওটা করেছে এবং আমি ভিডিওটা নাকি ছড়িয়ে দিয়েছি। আমি যদি ভিডিওটা করেও থাকি, ছড়িয়েও থাকি, হোয়াট ইজ দ্য প্রুফ দে আর হ্যাভিং।’
অর্থাৎ, তাহসিফ অভিযোগটির পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে, সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার বক্তব্যে ভিডিওটি ধারণ করা এবং সেটি ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে স্বীকার করা হয়নি।
একই আলোচনায় নিজের বিমানবাহিনীর চাকরি থেকে অব্যাহতির প্রসঙ্গ টেনে তাহসিফ বলেন, ‘এটাও হতে পারে, এজন্য (এই অভিযোগের জন্য) আমি হয়তো আজকে এয়ারফোর্সে নেই।’
এরপর উপস্থাপক সরাসরি জানতে চান, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার কারণেই কি তাকে বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল?
জবাবে তাহসিফ বলেন, ‘হতে পারে। যে ঘটনাগুলো ওই সময় ঘটেছিল। সবকিছু আমি বলব না। আমারও কিছু অপরাগতা আছে। আমার মনে হয়, এই অভিযোগের কারণে তারা এই জিনিসটা করেছে।’
তাহসিফের এই বক্তব্যে তার চাকরি থেকে অব্যাহতির সম্ভাব্য কারণ নিয়ে একটি ধারণা পাওয়া গেলেও বিষয়টি নিশ্চিত হয় না। তিনি নিজেও ‘হতে পারে’ বলে সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন এবং ওই সময়ের সব ঘটনা প্রকাশ করতে অপারগতার কথা জানিয়েছেন। ফলে শুধু এই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তার চাকরি ছাড়ার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
তুরাগ নদ থেকে যেভাবে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ
নিখোঁজ হওয়ার পর গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে ঢাকার উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করেন টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। পরদিন, ২৯ অক্টোবর পুলিশ তার পরিচয় ও মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করে।
নৌ পুলিশ সূত্রের বরাতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে নদ থেকে মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
তবে মরদেহ উদ্ধারের সময় পর্যন্ত তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফল সামনে না আসা পর্যন্ত এটি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু—সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
মৃত্যুর আগে তাহসিফ কোথায় গিয়েছিলেন, কী পরিস্থিতিতে নিখোঁজ হয়েছিলেন এবং নদে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তার মৃত্যুর সঙ্গে ভিডিও বিতর্কের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।
ভিডিও বিতর্ক ও তাহসিফের মৃত্যু: এখনো যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি
তাহসিফের মৃত্যুর পর তার বন্ধুর ফেসবুক পোস্ট এবং পুরোনো পডকাস্টের বক্তব্য সামনে আসায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ভিডিও বিতর্কটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে এখানে কয়েকটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি। ভিডিওটি কে ধারণ করেছিলেন, কে সেটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, এ ঘটনায় তাহসিফের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ উঠেছিল এবং তার চাকরি থেকে অব্যাহতির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর পেতে পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন।
একইভাবে, তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে ওই ভিডিও বিতর্কের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা কেবল বন্ধুর ফেসবুক পোস্ট কিংবা তাহসিফের পডকাস্টের বক্তব্য দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। ইনতিসারের পোস্টে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার যে ধারণা তুলে ধরা হয়েছে, সেটিও এখন পর্যন্ত তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য নেই।
অন্যদিকে, পডকাস্টে তাহসিফের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগের পক্ষে প্রমাণের প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং চাকরি থেকে অব্যাহতির সম্ভাব্য কারণ নিয়ে নিজের ধারণা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার বক্তব্যও অভিযোগগুলোর সত্যতা বা চাকরি ছাড়ার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করে না।
সব মিলিয়ে, তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, নিখোঁজ হওয়ার আগে তার সঙ্গে কী ঘটেছিল এবং ৫ আগস্টের ভিডিও নিয়ে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে তার চাকরিজীবনের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। নির্ভরযোগ্য তদন্তের ফল, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং প্রামাণ্য তথ্য সামনে এলেই বিষয়গুলো সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
















