জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। অথচ এই শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জীবনের বাধা হতে দেননি নরসিংদীর আলতাফ হোসেন দুখু মিয়া। পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম ধরে লেখাপড়া করে অর্জন করেছেন উচ্চশিক্ষা। চাকরি না পেয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেই গড়ে তুলেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখন সেই পা দিয়েই ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে দেড় শতাধিক শিশুকে পাঠদান করছেন তিনি। নিজের জীবন গড়ার পাশাপাশি অন্যদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই যেন হয়ে উঠেছে দুখু মিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা গ্রামের আলতাফ হোসেন দুখু মিয়ার জন্ম ১৯৬২ সালে। জন্মের পর তার দুই হাত নেই—এ কথা জানতে পেরে স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়েছিলেন তার বাবা-মা। সেই কষ্ট থেকেই আদর করে ছেলের নাম রাখা হয় ‘দুখু মিয়া’। তবে সময়ের সঙ্গে সেই নাম আর হতাশার প্রতীক হয়ে থাকেনি। কঠিন বাস্তবতাকে জয় করে সেটিই হয়ে উঠেছে তার সংগ্রাম ও সাফল্যের পরিচয়।
শৈশব থেকেই পড়াশোনার প্রতি ছিল দুখু মিয়ার গভীর আগ্রহ। কিন্তু দুই হাত না থাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতো খাতা-কলম নিয়ে পড়াশোনা করা তার জন্য ছিল অসম্ভব। ছেলের আগ্রহ দেখে হাল ছাড়েননি বাবা-মাও। মা রান্নার পাতিলের নিচে জমে থাকা কালো আস্তরণ সংগ্রহ করে তা দিয়ে কালি তৈরি করতেন। আর বাবা বাঁশের কঞ্চি কেটে বানিয়ে দিতেন দোয়াত ও কলম। সেই কলম পায়ের আঙুলের ফাঁকে ধরে কলাপাতায় লেখার মধ্য দিয়েই শুরু হয় দুখু মিয়ার শিক্ষাজীবন।
মায়ের শখ পূরণে হাতির পিঠে চড়ে বিয়ে করতে গেলেন সাকিব!

প্রথম দিকে বাবা তাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুই হাত না থাকায় পা দিয়ে আরবি বই ধরা ও লেখার বিষয়টি দেখিয়ে সেখানে তাকে ভর্তি করা হয়নি। পরে গ্রামের একটি স্কুলে ভর্তি হন তিনি। সেখানেও তাকে নানা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হতে হয়েছে। তবে অন্যের কথায় থেমে যাননি দুখু মিয়া। বরং বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণাকে শক্তি করে পায়ের আঙুলে কলম ধরেই চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা।
সংগ্রামের সেই পথ পেরিয়ে ১৯৮২ সালে এসএসসি এবং ১৯৮৪ সালে এইচএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে উচ্চশিক্ষা অর্জনের এই সাফল্যই ছিল তার জীবনের অন্যতম বড় অর্জন।
তবে শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পরও তার সংগ্রাম থামেনি। উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও দুই হাত না থাকার কারণে সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাননি তিনি। বিভিন্ন জায়গায় চাকরির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত নিজের ও পরিবারের খরচ চালাতে টিউশনি শুরু করেন। কিন্তু টিউশনি থেকে পাওয়া আয় দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে অন্যের অধীনে চাকরি করার আশা ছেড়ে নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন দুখু মিয়া। নিজের সঞ্চয় ও পৈতৃক জমিকে কাজে লাগিয়ে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’। ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করা সেই প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে এলাকার শিশুদের জন্য একটি পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। সেখানে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের পাঠদানের জন্য রয়েছেন নয়জন শিক্ষক। আর প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দুখু মিয়াও নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পড়ান। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, দুই হাত না থাকলেও তিনি পায়ের আঙুলের সাহায্যে কলম ধরে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে শিশুদের পাঠদান করেন।
নিজের জীবনের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে আলতাফ হোসেন দুখু মিয়া বলেন, জন্মের পর দুই হাত না থাকায় বাবা-মা তাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। প্রথমে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর চেষ্টা করলেও সেখানে তাকে নেওয়া হয়নি। পরে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরও অনেকের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য সহ্য করতে হয়েছে। তবে মা-বাবার অনুপ্রেরণাই তাকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মা রান্নার পাতিল থেকে কালি সংগ্রহ করতেন, আর বাবা বাঁশের কঞ্চি কেটে দোয়াত-কলম বানিয়ে দিতেন। সেই কলম দিয়ে কলাপাতায় লিখেই আমার পড়াশোনার শুরু। পরে ধীরে ধীরে উচ্চশিক্ষা অর্জন করি।’
চাকরি না পাওয়ার বিষয়ে দুখু মিয়া বলেন, ডিগ্রি অর্জনের পরও দুই হাত না থাকায় কোথাও চাকরি পাননি। অনেক জায়গায় চেষ্টা করেও সুযোগ মেলেনি। টিউশনি করেও নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত জীবন চালানোর পাশাপাশি অন্যদের জন্য কিছু করার লক্ষ্যেই নিজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।
এখন দুখু মিয়ার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন তার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিকে আরও বড় করা। বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চললেও ভবিষ্যতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের ব্যবস্থা করতে চান তিনি। তবে বিদ্যালয়ের নয়জন শিক্ষকের বেতনসহ অন্যান্য খরচ বহন করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। আর্থিক সংকটের কারণে অনেক সময় দুই-তিন মাস পর শিক্ষকদের বেতন পরিশোধ করতে হয়।
বিদ্যালয়টি আরও এগিয়ে নিতে সরকারের সহযোগিতা চান দুখু মিয়া। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানটিকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালুর অনুমোদনের পাশাপাশি শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন দেওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হোক।
জন্ম থেকেই দুই হাত না থাকা মানুষটি একসময় সমাজের অনেকের চোখে ছিলেন অসহায়। কিন্তু নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণা আর কঠোর পরিশ্রমে সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছেন দুখু মিয়া। পায়ের আঙুলে কলম ধরে যে মানুষটি নিজের শিক্ষাজীবনের পথ তৈরি করেছিলেন, আজ সেই পা দিয়েই শত শত শিশুর ভবিষ্যতের পথ দেখাচ্ছেন। তার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিশুর স্বপ্ন যেন দুখু মিয়ার নিজের সংগ্রামেরই নতুন এক অধ্যায়।

















