নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নির্ধারণে সংসদের উচ্চকক্ষ ও ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টির প্রস্তাব উঠে এসেছে। এ ছাড়া সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচন করে তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার ধারণাও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব প্রস্তাবের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষাবিদদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপদ্ধতি, কাঠামো, আকার, কার্যপরিধি ও এখতিয়ার নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন বিকল্প ধারণা তুলে ধরেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কমিটির কাছে কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে আসেনি।
নাহিদ পদত্যাগ না করলে নৈতিক ভিত্তি থাকবে না: রাশেদ খাঁন!

আলোচনায় উঠে আসা একটি প্রস্তাবের ব্যাখ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সেটিকে সংসদের একই মেয়াদে বহাল রাখার ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চকক্ষের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সুযোগ রাখা সম্ভব কি না, সেটিও বিবেচনায় এসেছে।
এ ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের জন্য ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টি এবং তাঁকে স্পিকারের দায়িত্ব দেওয়ার ধারণাও আলোচনায় এসেছে বলে জানান তিনি। বিকল্প হিসেবে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্মতির ভিত্তিতে স্পিকার নির্বাচন করে তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাবও দিয়েছেন কেউ কেউ। একইভাবে স্পিকার ছাড়া অন্য উপদেষ্টাদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবস্থা রাখার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
তবে এসব ধারণাকে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করা হবে এবং প্রতিবেদন তৈরির সময় বিভিন্ন মতামত ও বিকল্প তুলে ধরা হবে। পরবর্তী সময়ে ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন প্রণয়নের জন্য বিল আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া ও এখতিয়ার নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লিখিত প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছে কমিটি। লিখিত মতামত পাওয়া গেলে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা সহজ হবে বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগকে বাইরে রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। সালাহউদ্দিন আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচনার সময় উঠে আসা ধারণার আলোকে বিচার বিভাগকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে এবং রাষ্ট্রপতির সর্বশেষ বিকল্পটি বাদ দিয়ে কীভাবে সংশ্লিষ্ট সবার সম্মতির ভিত্তিতে সরকার গঠন করা যায়, তা নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হয়েছে। কমিটির লক্ষ্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সর্বসম্মত উপায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পথ বের করা।
২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের প্রসঙ্গও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ওই সময় সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে অনেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল না করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, কমিটির সদস্যদের মধ্যেও এ বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। তবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণের বিষয়েও কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, বিরোধী দলকে কমিটির বৈঠকে যোগ দেওয়ার আহ্বান আগেও জানানো হয়েছে, এখনো জানানো হচ্ছে। কোনো বিষয়ে তাদের নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত পরিবর্তন কিংবা শিথিল করার ইচ্ছা থাকলে কমিটির বৈঠকে এসে তা জানাতে হবে। তখন বিষয়টি বিবেচনা করা সম্ভব হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, প্রতিটি বৈঠকেই বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। সংসদেও তাদের আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিরোধী দলকে কমিটিতে এসে নিজেদের বক্তব্য ও মতামত তুলে ধরার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নির্ধারণে উচ্চকক্ষ, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও স্পিকারকে কেন্দ্র করে একাধিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে কোন পদ্ধতি চূড়ান্ত হবে, তা নির্ভর করছে কমিটির পর্যালোচনা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত এবং পরবর্তী আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ার ওপর।
















