দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে চার দিনের সরকারি জাপান সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে দুই দেশের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের দুটি ঋণ সহায়তা প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েনের সম্ভাব্য বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাত ২টা ৪৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ তথ্য জানান।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীদের নিয়ে ফ্লাইটটি বৃহস্পতিবার জাপানের স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে।
ব্যাটারিচালিত রিকশার গতিসীমা ২৫ কিলোমিটার, নিবন্ধন ফি নির্ধারণ!

বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেন। বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়।
গত ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে জাপানি একটি প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়েও আলোচনা করেন তাঁরা।
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি মোট ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের দুটি ঋণ সহায়তা প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে একটি টহল জাহাজ সংগ্রহের জন্য ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ১৩ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত অনুদান সহায়তার চুক্তি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন, কৃষি, দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতা নিয়েও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতার জন্য একটি আগ্রহপত্রও স্বাক্ষরিত হয়েছে।
ঋণ সহায়তার আওতায় থাকা দুটি প্রকল্পের মধ্যে একটি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে এবং অন্যটি উপজেলা শাসন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।
সরকারি পর্যায়ের চুক্তির পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের তথ্য অনুযায়ী, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) উদ্যোগে দুই দেশের বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
গত ২৮ অক্টোবর টোকিওতে জেট্রোর সদর দপ্তরে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরাম ডায়ালগ’-এ বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিনি জাপানি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের পাঁচটি অগ্রাধিকারমূলক খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। খাতগুলো হলো অটোমোবাইল উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ, উচ্চগতির রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়া এবং জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এ ছাড়া জাপানের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল পোশাক খাতের জায়ান্ট ইউনিক্লো, মিতসুই অ্যান্ড কোং, সুমিতোমো করপোরেশন এবং জেরা। বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, নতুন কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
শুধু বৈঠকেই সীমাবদ্ধ ছিল না প্রধানমন্ত্রীর সফর। জাপানের শিল্প, জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামো সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নিতে তিনি বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেন।
গত ২৭ অক্টোবর ফুত্তসুতে অবস্থিত জেরার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ইচিকাওয়ায় অবস্থিত নিতসুর লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) তিনি নাগোয়া সফর করেন। সেখানে জাপানের অটোমোবাইল উৎপাদন সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা নিতে টয়োটা মোটর করপোরেশনের মোতোমাচি কারখানা এবং টয়োটা মেমোরিয়াল মিউজিয়াম অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজি পরিদর্শন করেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী দেশ। ঢাকা মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ দেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের সহায়তা রয়েছে।
এবারের সফরে দুই দেশের প্রথম অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারণে নতুন কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শিল্প, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে জাপানি বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
















