বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধারের পর তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন তাঁর স্বজনেরা। তাহসিফের খালাতো বোন মোশফেকা জাহান অভিযোগ করেছেন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করার কারণে তাঁকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
তাহসিফের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আবেগঘন একটি পোস্ট দেন তাঁর খালাতো বোন মোশফেকা জাহান। সেখানে তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, তাঁর ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাহসিফের বিরুদ্ধে নেওয়া আগের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং তাঁর মৃত্যুর পেছনে সম্ভাব্য কারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে মোশফেকা জাহান লেখেন, “আমার ভাইকে মার্ডার করা হয়েছে। কী দোষ ছিল তার? হাসিনার পালানোর ভিডিও শেয়ার করা?” তাঁর দাবি, তাহসিফ নিজে ভিডিওটি ধারণ করেননি; একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছিলেন। ভিডিওটি তাঁর কোনো সহকর্মী ধারণ করে থাকতে পারেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
লালমনিরহাটে হেযবুত তওহীদের নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত

মোশফেকা আরও অভিযোগ করেন, এ ঘটনার পর তাহসিফকে অন্যায়ভাবে চাকরি থেকে অবসরে পাঠানো হয়েছিল এবং দিনের পর দিন মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পরও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নিয়মিত তাহসিফকে অনুসরণ করতেন বলে তিনি তাঁকে জানিয়েছিলেন।
তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তাঁর খালাতো বোন। পরিবারের সদস্যদের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে সক্রিয় থাকা এবং তাহসিফের দেশপ্রেমের কারণেই তাঁকে এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
এদিকে, ফেসবুকে দেওয়া আরেকটি পোস্টে মোশফেকা জাহান তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর নাম ব্যবহার করে কোনো সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন। ফলে তাঁর বক্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে অনুমতি ও সূত্র উল্লেখের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির নাম ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিল। তবে ভিডিওটি ফাঁসের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়টি সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। অন্যদিকে, আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট জানিয়েছিল, কোনো সুনির্দিষ্ট শাস্তিমূলক অভিযোগ ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়ায় তাহসিফকে অবসরে পাঠানো হয়েছিল।
নৌপুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন তাহসিফ। পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে গাজীপুরের টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির একটি দল তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় অভিযান চালায়। সেখান থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহ উদ্ধারের সময় তাঁর পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো পাঞ্জাবি। হাতে থাকা হাতঘড়ি এবং পকেটে পাওয়া আইফোনের সূত্র ধরে পুলিশ তাঁর পরিচয় শনাক্ত করে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের জন্য মরদেহ রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলো কাজ শুরু করেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের ফলাফল সামনে এলে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত তাহসিফের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে পরিবারের পক্ষ থেকে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। তাই মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করা হচ্ছে।
















