ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নাম নয়, বরং এটি একটি ভাইরাস, যা সমাজের সর্বক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের অধিকার নিশ্চিত না হলে দেশে বারবার বিপ্লব ফিরে আসবে। যারা জনগণের মনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হবেন, তাদের পরিণতিও ৭ নভেম্বরের মতো হতে পারে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সমাজের সর্বক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের লক্ষণ এখন স্পষ্ট। ৭ নভেম্বরের ইতিহাস থেকে রাজনীতিবিদদের যে শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, তারা সেই শিক্ষা নিতে পারেননি। এই দিবসের তাৎপর্য শুনতে শুনতেই তার জীবনের ৫৫ বছর কেটে গেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জিয়ার নব্য সৈনিকরা কি বিএনপি-জামায়াতের ২৩ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস ভুলে গেছেন?

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি বিদ্রোহের পেছনের কারণ তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ মুজিবুর রহমান দেশের ইসলামী সংগঠনগুলো নিষিদ্ধ করেছিলেন। অথচ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এসব সংগঠন সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো কাজ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিপুল জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হওয়ার পরও অল্প সময়ের মধ্যে তিনি জাতির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন। সেনাবাহিনী, পুলিশ, গণমাধ্যম ও আনসার বাহিনী থাকা সত্ত্বেও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছিল। সেনাবাহিনীকে উপেক্ষা করে রক্ষীবাহিনীর হাতে ব্যাপক ক্ষমতা ও ভারী অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রক্ষীবাহিনীর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান আরও অভিযোগ করেন, বাহিনীটিকে এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল যে কাউকে হত্যা কিংবা নারীকে ঘর থেকে তুলে নেওয়ার মতো ঘটনার জন্যও তাদের জবাবদিহি করতে হতো না। তার দাবি, এভাবে ৩৪ হাজার মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা।
মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদারের হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, সিরাজ শিকদারকে হত্যার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে ‘কোথায় সে?’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তার মতে, এ ধরনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সে সময় বিচারব্যবস্থার প্রতি অবজ্ঞা এবং অবিচারকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল।
৭ নভেম্বরের ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের অবজ্ঞা, অপমান ও উপেক্ষা করার কারণে তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই মূলত সেদিনের অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। তবে ঘটনার শুরুতে এতে জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সেদিনের পরবর্তী পরিস্থিতির স্মৃতিচারণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৭ নভেম্বরের পরদিন শুক্রবার সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয়েছিল। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারফিউ বলবৎ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য তিন ঘণ্টা কারফিউ শিথিল করা হয়েছিল।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সে সময় তিনি সিলেটের এমসি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। জুমার নামাজ আদায়ের জন্য বের হয়ে মসজিদ, বাড়িঘরের ছাদ ও রাস্তাঘাটে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত মানুষের উপস্থিতি দেখেছিলেন। মানুষের মধ্যে সেদিন ব্যাপক উচ্ছ্বাস ছিল বলেও জানান তিনি। তার মতে, কারফিউ শিথিলের সময় মানুষের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে জনসমর্থনের একটি চিত্র ফুটে উঠেছিল।
এ সময় স্বাধীনতার ইতিহাসে বিভিন্ন ব্যক্তির অবদান যথাযথভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ইতিহাসে কাউকে ছোট করার প্রয়োজন নেই। স্বাধীনতার ঘোষণা যিনি দিয়েছেন, তার পাশাপাশি স্বাধীনতার পতাকা যিনি উড়িয়েছিলেন, সেই তরুণ নেতার অবদানও আলোচনায় আসা উচিত। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের সফল নেতৃত্ব দেওয়া জেনারেল ওসমানীর অবদানও যথাযথভাবে স্বীকার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নিজের বা নিজের দলের নেতৃত্ব ছাড়া অন্য কারও অবদান স্বীকার না করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যার যেখানে অবদান রয়েছে, তাকে সেই স্বীকৃতি দিতে হবে।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। এ সময় দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
















