মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে থাকার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করলেও নিজের কোনো ভুল হয়নি বলে দাবি করেছেন সদ্য পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। নিজের নিরাপত্তার জন্যই লাইসেন্স করা অস্ত্র হাতে রেখেছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অস্ত্রকাণ্ডের বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন ইশরাক। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চাওয়ার কথাও জানান তিনি। তবে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এই সংসদ সদস্য।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেন, ‘যদি আমার দ্বারা কোনো ভুল হয়ে থাকে, আমি কাউকে আঘাতপ্রাপ্ত করে থাকি এই অভিযানের মাধ্যমে, সেটার জন্য আগে আমি দুঃখ প্রকাশ করে নিচ্ছি। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমি কোনো ভুল সেদিন করিনি। আমি কেবল আমার নিরাপত্তার জন্য আমার হাতে অস্ত্রটুকু যতটুকু সময় প্রয়োজন রেখেছিলাম, পরবর্তীকালে সেটি আর আমার দৃশ্যমান হয়নি।’
শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘরে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা ব্যাখ্যা করে ইশরাক বলেন, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করেই তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন। তাঁর লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্রটি সাধারণত কোমরে থাকে। অভিযানের সময় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে আত্মরক্ষার জন্যই তিনি অস্ত্রটি হাতে নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
জামায়াত নেতার বক্তব্যে ব্যথিত ইশরাক, বললেন ‘জীবন বাজি রেখে গিয়েছি’

ইশরাক আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে মাদকাসক্তদের হাতে অস্ত্র না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে তিনি মনে করেন। তবে ওই ভিডিও প্রকাশের পর গণমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যার কিছু সত্য হলেও কিছু প্রতিবেদন অতিরঞ্জিত ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অস্ত্রকাণ্ডের পর পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন জানিয়ে ইশরাক বলেন, রাতে তিনি জানতে পারেন, ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। তাঁর দাবি, ওই দিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর ১৩টি জায়গা পরিদর্শন করেছিলেন। কিন্তু তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনা ও সংবাদে প্রধানমন্ত্রীর এসব কর্মকাণ্ড আড়ালে পড়ে যায়।
ইশরাক জানান, পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তিনি মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরেন এবং প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিজের কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যেন প্রধানমন্ত্রীর অন্যান্য কার্যক্রম আড়ালে না পড়ে, সে বিষয়টিও তিনি বিবেচনায় নিয়েছেন।
পদত্যাগের বিষয়ে ইশরাক বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন। ঢাকা-৬ আসনসহ আশপাশের এলাকায় মাদক নির্মূল এবং জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চান তিনি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সম্মতি দিয়েছেন বলেও দাবি করেন ইশরাক।
সংবাদ সম্মেলনের আগে বেলা পৌনে দুইটার দিকে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে প্রবেশ করেন তিনি। এ সময় তাঁর অনুসারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। বেলা দুইটার দিকে সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়। বক্তব্য শেষে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে প্রেসক্লাব ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন ইশরাক। পরে গাড়িতে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডমাইকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেন। বেলা ২টা ৫৬ মিনিটের দিকে তিনি প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন।
এর আগে রোববার রাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত ওই খবরে বলা হয়, সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। তবে খবরটি প্রকাশের পর ইশরাক ফেসবুক পোস্ট ও হোয়াটসঅ্যাপে অডিও বার্তার মাধ্যমে সেটিকে গুজব বলে দাবি করেছিলেন। তাঁর প্রেস কর্মকর্তাও খবরটিকে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর বলে প্রতিবাদ জানান।
পরে সোমবার সকালে নিজের ফেসবুক পেজে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক। দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।
উল্লেখ্য, শনিবার গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘরে মাদকবিরোধী অভিযানে ইশরাকের আগ্নেয়াস্ত্র হাতে থাকার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি বিএনপি ও সরকারের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে ইশরাকের দাবি, তিনি মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন এবং নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই বৈধ অস্ত্র হাতে রেখেছিলেন।

















