রাতের অন্ধকারে নদীতে জাল ফেলা হচ্ছে। আবার দিনের আলোতেও কোথাও নৌকা নিয়ে চলছে ইলিশ শিকার, কোথাও নির্দিষ্ট ক্রেতার ফোন পেয়ে ব্যাগে ভরে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে নিষিদ্ধ সময়ে ধরা মাছ। অপরিচিত কেউ ইলিশ কিনতে চাইলে আগে জানতে চাওয়া হচ্ছে নাম-পরিচয়। কোথাও সরাসরি মাছ না দিয়ে নির্ধারিত স্থানে টাকা রেখে যাওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। অথচ মা ইলিশ রক্ষায় নদী ও সাগরে মাছ ধরার ওপর চলছে সরকারি নিষেধাজ্ঞা।
পটুয়াখালীর গলাচিপায় এমন চিত্রই উঠে এসেছে বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন ঘুরে পাওয়া তথ্য ও স্থানীয়দের অভিযোগে। নিষেধাজ্ঞা, প্রশাসনের অভিযান কিংবা শাস্তির ভয়, কোনোটিই যেন পুরোপুরি থামাতে পারছে না ইলিশ শিকার ও গোপন বেচাকেনা। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও দালালচক্রের সহযোগিতায় নির্দিষ্ট ক্রেতাদের কাছে এই অবৈধ কারবার চলছে।
একদিকে মা ইলিশ রক্ষায় প্রশাসনের অভিযান, অন্যদিকে নদীতে জাল ফেলে ইলিশ ধরার তৎপরতা -এই দুই বিপরীত চিত্রে প্রশ্ন উঠছে, তাহলে নিষেধাজ্ঞার সুফল কতটা মিলছে? আর যাদের রক্ষা করতে এই নিষেধাজ্ঞা, সেই ইলিশ ও জীবিকার ওপর নির্ভরশীল জেলেদের ভবিষ্যৎই বা কতটা নিরাপদ থাকছে? গলাচিপার প্রত্যন্ত চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ইলিশ ধরা এবং বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, উপজেলার অন্তত ১০ থেকে ১৫টি স্থানে দালাল ও নির্ধারিত ক্রেতাদের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে অবৈধভাবে ধরা ইলিশ কেনাবেচা চলছে। গত তিন দিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
আওয়ামী লীগকে ‘পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চোরের দল’ বললেন স্পিকার!

স্থানীয়দের ভাষ্য, ফোনে যোগাযোগ করলেই ইলিশ পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অপরিচিত ক্রেতার কাছে সহজে মাছ বিক্রি করা হয় না। আগে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়, এরপর ঠিক হয় মাছ সরবরাহের স্থান ও পদ্ধতি। নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে অর্ডার দিলে ব্যাগে করে মাছ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে অভিযোগ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, এসব কারবারের সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস পান না অনেকে। তাদের দাবি, মাছ ধরতে যাওয়ার সময় কিংবা মাছ নিয়ে ফেরার পথে ক্যামেরাসহ মোবাইল ফোন ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা থাকে, যাতে ভিডিও কিংবা তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করে তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা না থাকে।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চরকাজল ইউনিয়নের লঞ্চঘাট, চরশিবা লঞ্চঘাট ও বড় শিবা; চরবিশ্বাস ইউনিয়নের চরআগস্তি, জিমতলা, নোমোর স্লুইসগেট, আমড়াগাছিয়া, চরবাংলা খেয়াঘাট ও চরবাংলা; রতনদী তালতলী ইউনিয়নের বন্যাতলী ও পাতাবুনিয়া স্লুইসগেট; সদর ইউনিয়নের চরকারফারমা; পানপট্টি লঞ্চঘাট, বটতলা বাজার, বোয়ালিয়া স্লুইসগেট, পক্ষিয়া স্লুইসগেট, লোন্দা স্লুইসগেট এবং গলাচিপা-পাটুয়া খেয়াঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে ইলিশ ধরা ও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া গলাচিপা পৌর এলাকার কাছের রামনাবাদ নদী, চিকনিকান্দির দয়াময়ী মন্দিরসংলগ্ন তেঁতুলিয়া নদীর পয়েন্ট, বন্যাতলীর তেঁতুলিয়া নদীর পয়েন্ট এবং পানপট্টি লঞ্চঘাটসংলগ্ন ও বটতলা বাজার এলাকায় আগুনমুখার মোহনায় রাতের আঁধারে জাল ফেলার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, প্রশাসনের টহল ট্রলার দেখলে কোনো কোনো নৌকা দ্রুত সরে যায়। কেউ কেউ বন বিভাগের সংরক্ষিত বনে আশ্রয় নিয়ে আত্মগোপন করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, দুপুরের পর নদীর পাড়ে গেলে দেখা মেলে ছোট ছোট নৌকায় তিন থেকে চারজন মিলে ইলিশ শিকার করছেন। নদীর পাড়ে বিভিন্ন স্থানে জেলেদের লোক বসে থাকে এবং প্রশাসনের অভিযানের বোট আসতে দেখা মাত্র খবর পৌঁছে দেয় জেলেদের কাছে। তাৎক্ষণিক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিনচালিত এসব নৌকা তীরে ফিরে ধানখেত কিংবা বনের ভেতর লুকিয়ে পড়ে। এসব ঘটনার বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান চালাতে গিয়ে প্রশাসনকে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও তথ্য রয়েছে। বিশেষ করে চরবিশ্বাস ইউনিয়নের নোমোর স্লুইস এলাকায় অভিযান চলাকালে সংঘবদ্ধ একটি চক্র প্রশাসনের ট্রলারের দিকে তেড়ে আসে, ইটপাটকেল ছোড়ে এবং চিৎকার-চেঁচামেচি করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করে বলে জানিয়েছেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা।
অভিযোগ রয়েছে, একদিকে প্রশাসনের অভিযান চলছে, অন্যদিকে আশপাশের নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরার তৎপরতাও থেমে থাকছে না। এতে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।
গলাচিপা উপজেলা মৎস্য অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার প্রথম ১২ দিনে ৩৮টি অভিযান ও ৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময়ে মৎস্য বিভাগ ২৮৫ কেজি (সংবাদ অনুযায়ী তথ্য অপরিবর্তিত রেখে) ইলিশ এবং এক লাখ ৭২৫ মিটার জাল জব্দ করেছে, যার বাজারমূল্য ২৬ হাজার ৯৪০ টাকা। এ ছাড়া ১২টি মামলায় ছয়জন জেলেকে সাজা ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, “মৎস্য অফিস ও সরকার ঘোষিত বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গলাচিপার অনেক এলাকা দুর্গম ও প্রত্যন্ত হওয়ায় সব জায়গায় দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয় না। তবে এসব এলাকাতেও অভিযান চালানো হচ্ছে।”
চরবিশ্বাসের নোমোর স্লুইস এলাকায় অভিযোগ, সময় বাধার বিষয়ে তিনি বলেন, “ওই এলাকাটি দুর্গম। সেখানে অভিযান চলাকালে সংঘবদ্ধ একটি চক্র আমাদের ওপর হামলার চেষ্টা করে এবং ডাকচিৎকার করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।”
















