তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংস পরিস্থিতি মোকাবিলায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনকে ব্যবহার করে মিরপুর, সাভার ও গাজীপুরে সহিংসতা ও অস্থিরতা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা, জীবনমান উন্নয়ন এবং পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলেছেন তিনি।
শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন পর্যবেক্ষণ করছিল সরকার। আন্দোলনের পেছনে শ্রমিকদের প্রকৃত অসন্তোষের পাশাপাশি কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আন্দোলনের পেছনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
এনসিপির নতুন ক্রীড়া সংগঠনের আত্মপ্রকাশ আজ!

বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পোশাক শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা, জীবনমান উন্নয়ন, উৎপাদন ও উন্নয়ন কার্যক্রম সচল রাখা এবং রপ্তানি বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সহিংসতা, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ এবং অযথা বিশৃঙ্খলা বা অস্থিরতা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনায় বিভিন্ন পর্যায়ে মুখোশধারীদের অনুপ্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারের কাছে থাকা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিরীহ পোশাক শ্রমিকদের ব্যবহার করে সীমান্তের ওপার থেকে কেউ কেউ ইন্ধন জোগাচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি, রপ্তানি বাণিজ্য ব্যাহত এবং পোশাকশিল্পের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকার কঠোরভাবে মোকাবিলা করবে বলেও জানান।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য স্বার্থ ও জীবনমান উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। মজুরি বোর্ডকেও এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, তৈরি পোশাকশিল্পের উন্নয়ন এবং রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখাই সরকারের লক্ষ্য।
ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন
এদিকে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। পরে মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
গঠিত বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিন মালিকপক্ষের এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ডে দায়িত্ব পালন করবেন।
দিনভর শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ
ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে কয়েক দিন ধরেই রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ চলছে। রোববারও রাজধানীর মিরপুর এলাকায় পোশাক শ্রমিকদের অবরোধকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় বেশ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ।
এর আগে ২০২৩ সালে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে মজুরি বেড়েছিল ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। এবার শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবি উঠেছে।
শ্রমমন্ত্রীর বিদেশ সফর বাতিল
শ্রমিক আন্দোলনের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর বাতিল করেছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। রোববার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পোশাকশিল্পের চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন তিনি।
আন্দোলনের পেছনে ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে শ্রমমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি তাঁর কাছে স্পষ্ট। একটি ছাত্রসংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদককে শ্রমিক পরিচয়ে আন্দোলনে অংশ নিতে দেখা গেছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ-সংক্রান্ত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
মজুরি বোর্ড গঠনকে স্বাগত বিকেএমইএর
পোশাকশিল্পে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)।
রোববার দেওয়া এক বিবৃতিতে সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা যে চাপের মধ্যে রয়েছেন, তা মালিকপক্ষও উপলব্ধি করে। তবে বৈশ্বিক মন্দা, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কারখানায় রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার মতো চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন সচল রাখা এবং দেশের পোশাকশিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
















