সরকার কি কেবল সরকারি কর্মচারীদের? সরকারি কর্মচারীরাই কি কেবল জনগণ? অন্যান্য শ্রমিকরা কি এদেশের সিটিজেন নয় নাকি তারা মানুষই নয়? -এই প্রশ্নগুলো পুরনো হলেও নতুন করে সামনে আসছে। সামনে এসেছে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রসঙ্গ ধরে।
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসবে, নতুন প্রধানমন্ত্রী গদিতে বসবেন, মন্ত্রীসভায় নতুন নতুন মুখ দেখা যাবে আর সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়বে না- এ যেন হবার নয়। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথেই তারা বসবেন নতুন পে-স্কেল প্রণয়নে; এটা এখন আমাদের দেশের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের গণতন্ত্র যেন অনেকটা সরকারে-আমলায়। প্রতিটি সরকারই যেন ‘আমলা ফাস্ট’ নীতিতে চলে— অবস্থাদৃষ্ট তাই বলে।
নির্বাচনের সময় জনগণ ফোকাসে থাকলেও নির্বাচন পরবর্তী পাঁচ বছর তারা উহ্য থাকে, ব্লার থাকে। সরকার গঠনের পর স্লোগানও যেন রিভার্স হয়ে হয়ে যায়- অব দ্য আমলা, বাই দ্য আমলা, ফর দ্য আমলা।
যোদ্ধাজাতির পাঠ: বাঁচতে হলে মরতে শিখো -এম আর হাসান

অব দ্য আমলা (আমলার): সরকার গঠিত হয় আমলাকে নিয়ে এবং এর সমস্ত ক্ষমতা ও বৈধতা আমলা থেকে আসে।
বাই দ্য আমলা (আমলাদের দ্বারা): একমাত্র আমলারা নিজেরা ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে সরকার গঠন করে।
ফর দ্য আমলা (আমলাদের জন্য): সরকারের মূল কাজ ও নীতিনির্ধারণ হবে আমলাদের কল্যাণ, উন্নয়ন ও অধিকার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ৭ মাসের মাথায় নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-এর গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই কাঠামোতে ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ১৪২% এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে (প্রথম গ্রেড) মূল বেতন ১০০% পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে (যা শীর্ষ কর্মকর্তাদের মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ করেছে)।
আমাদের দেশে এই সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশে নতুন সরকার বা পরিবর্তিত পরিস্থিতির পর সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাড়ানোর বা নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও পর্যায়ভিত্তিক।
সর্বশেষ বড় ধরনের বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালে (যা ২০১৬ সাল থেকে বাস্তবায়িত হয়েছিল), যেখানে সর্বোচ্চ গ্রেডে ৯৫% এবং সর্বনিম্ন গ্রেডে ১০১% মূল বেতন বাড়ানো হয়েছিল। এর আগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ষষ্ঠ জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৫ সালে অনুমোদন হয় বিএনপি সরকারের আমলে। তারও আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৭ সালে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়।
একজন গ্র্যাজুয়েটের বেসরকারি কোম্পানিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১৬-১৮-২২ হাজার টাকায় চাকরি করতে হয়। একজন কৃষক সার-সেচের দাম মিটিয়ে উৎপাদন খরচ ওঠাতে হিমশিম খায়। একজন মজুর ৫-৭শত টাকায় গাধার খাটুনি খাটে। একজন গার্মেন্টস শ্রমিক মাসের পর মাস সূর্যের মুখ দেখতে পায় না। নিয়ম করে ছুটি জোটে না। কোনো দুর্ঘটনায় ছুটি নিতে হলে পা ধরে পরে থাকতে হয়। কোনো ১২-১৪-১৬ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয় তাকে। তাদের ওভারটাইম মিলিয়েও তার বেতন সরকারি কর্মচারী ঝাড়ুদারের বেতনের ধারে কাছে যায় না। প্রবাসে শ্রমিকরা দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রতিনিয়ত নাস্তানাবুত হচ্ছে।
আর এদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৯-৫ টার সহনশীল কর্মঘণ্টা, স্মার্ট স্যালারি, সামাজিক মর্যাদা, শেষ জীবনে পেনশন নিরাপত্তা; এই চাকরিকে ‘সোনার হরিণ’ বিশেষণে বিশেষায়িত করেছে। এজন্যই বোধ করি সরকারি চাকরির প্রতি মানুষের এত আকাঙ্ক্ষা।
সরকারও তাদের নিজেদেরকে কারা সার্ভ করবে তা বাছাইয়ে খুব সতর্ক। কারা তাদের অতিবিশ্বস্ত সেই ক্যালকুলেশন করেই যেন নিয়োগ-বাছাই কার্যক্রম চালায়। আর এজন্য প্রায় প্রতিটি সরকারের বেলায়ই দলীয়করণের অভিযোগ ওঠে। ফলে সৃষ্টি হয় বৈষম্যের। এই বৈষম্যকে কেন্দ্র করেই ২০২৪ সালে মানুষকে জীবন দিতে দেখা গেছে। এই বাড়তি কেয়ার পাওয়ার আশায় মরিয়া হয়ে থাকে যেন সবাই। জীবন দিতেও কুণ্ঠা বোধ করে না; জুলাই-ই তার প্রমাণ। যদিও জুলাই আন্দোলন নিয়ে পরবর্তীতে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
কিন্তু দিনশেষে আমরা দেখেছি, সরকারি চাকরিতে দলীয়করণ ও তাদের ঘাড়ে ভর দিয়ে গদিতে টিকে থাকার এই প্রবণতা, এই সংস্কৃতি না সরকারকে স্টেবল রাখতে পারে, না জাতির উন্নতি ঘটাতে পারে।
সম্প্রতি রাজপথে নতুন বিক্ষোভ দেখতে পাচ্ছি আমরা। গার্মেন্টস শ্রমিকরা রাস্তায় নেমেছে বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে। ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা ও রেশনিং ব্যবস্থা চালুসহ কয়েকটি দাবিতে কারখানা ছেড়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছে তারা। এখানে তারা যে কম্পরিজম করেছে তা হলো- নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের সর্বনিম্ন বেতন ধরা হয়েছে ৩২ হাজার টাকা। এর সাথে কম্পেয়ার করে তারা সর্বনিম্ব বেতন ৩০ হাজার টাকার দাবি তুলেছে। এ নিয়ে পরিবেশ ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। মিরপুর, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারয়ণগঞ্জ এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিকরা কারখানায় না গিয়ে রাজপথ দখল করেছে। রাজপথে পুলিশ-শ্রমিকের সেই চিরাচরিত যুদ্ধ মিডিয়ায় প্রচার হচ্ছে। মানুষ সেসব দেখছে আর বরাবরের মতো বুকভরা সহানুভূতি নিয়ে ‘আহারে! আহারে!’ ডাক পাড়ছে।
সরকার পক্ষ আঙ্গুল তুলছে পতিত সরকার আওয়ামী লীগের দিকে। ২০২৪ সালে অভ্যুত্থানের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার চলতি বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আসার তথ্যকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এই আন্দোলন উৎপাদন করেছে এবং উসকে দিচ্ছে বলে মন্তব্য তাদের। আমার মতে, শ্রমিকদের ঘাড়ে ভর করে আওয়ামী লীগ অস্থিতিশিল অবস্থার সৃষ্টি করার চেষ্টা করে থাকলে তাতে অবাক হবার কিছু নেই। এমনটা বরাবরই হয়ে আসছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসব তো নাজায়েজ কোনো পন্থা নয়। বিগত দিনে সকল রাজনৈতিক দলকেই এমন পন্থা অবলম্বন করতে দেখা গেছে। কোটা আন্দোলনের উপর ভর করে সরকার পতনের স্মৃতি তো কারো স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- শ্রমিকদের এই দাবি কি অমূলক? তারা কি অন্যায্য কোনো দাবি তুলেছে? সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই কি কেবল দেশকে সার্ভ করছে? অন্যরা, শ্রমিকরা কি করছে না? নাকি তারা সরকারকে সরাসরি সার্ভ করছে বলেই তাদের প্রতি সরকারের এত কেয়ারিং। নাকি তাদের কাছে সরকার জিম্মি? এজন্য তাদের খুশি রাখতে, হাতে রাখতে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়াটা সরকারের তোয়াজের বহিঃপ্রকাশ?
কোট- সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি আমাদের সরকারগুলো যতটা কেয়ারিং এই গার্মেন্টসসহ অন্যান্য শ্রমিকদের ব্যাপারে ততটাই উদাসীন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়- সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে সরকারগুলো জিম্মি। আর গার্মেন্ট শ্রমিকরা যেন ডিজিটাল দাস। সরকারি কর্মচারীদের অফিস রুটিন সবারই জানা। আর গার্মেন্ট শ্রমিকরা সূর্যের মুখ দেখে না। কোনো এক গার্মেন্টস শ্রমিকের মুখে শুনেছিলাম- পরিশ্রম অনুযায়ী গার্মেন্টস= শ্রমিকদের যদি ন্যায্য মজুরি দেওয়া হতো তাহলে তারা হতো কোটিপতি।
একজনের প্রতি সদয় আরেকজনের প্রতি নির্দয় এই বৈষম্য দূর হলো কই? অথচ আমরা সকলে চেয়েছিলাম একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। নিরেট সত্য হলো- আমাদের সকলের স্বপ্নই ভঙ্গ হয়েছে। কেউ কথা রাখেনি।
যাই হোক, সরকার ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ডের গেজেট প্রকাশ করেছে। শ্রমিকদের তোলা দাবি নিয়ে শীঘ্রই আলোচনা হবে। নিশ্চয়ই একটি সমাধানে আসতে পারবে দুই পক্ষ।
[লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট]
















