ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে চতুর্থবারের মতো রাষ্ট্রপ্রধান হতে যাচ্ছেন বামপন্থি নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে থাকলেও রানঅফে ডানপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করেছেন তিনি। ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থানের জন্য পরিচিত লুলার এই জয় ব্রাজিলের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে নির্বাচনের ফল নিয়ে আপত্তি তুলে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন ফ্লাভিও বলসোনারো।
ব্রাজিলের নির্বাচন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সব ভোট গণনা শেষে লুলা ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৪৪ লাখ ভোট। এর মধ্য দিয়ে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের চতুর্থ মেয়াদ নিশ্চিত করেছেন লুলা। এর আগে তিনি ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদ এবং ২০২৩ সাল থেকে তৃতীয় মেয়াদে দেশটির দায়িত্ব পালন করেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত রানঅফের ফল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। ভোট গণনার শুরুর দিকে ফ্লাভিও এগিয়ে থাকলেও পরবর্তী সময়ে ব্যবধান কমিয়ে এগিয়ে যান লুলা। শেষ পর্যন্ত তাঁর জয় নিশ্চিত হয়।
রিয়াদ বিমানবন্দর ও সৌদির তেল পাইপলাইনে ফের হামলার দাবি হুথিদের!

প্রথম দফায় এগিয়ে থেকেও হার ফ্লাভিওর
গত ৪ অক্টোবর ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৭ দশমিক ০৩ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম অবস্থানে ছিলেন। অন্যদিকে লুলা পেয়েছিলেন ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোট। কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নির্বাচন গড়ায় দ্বিতীয় দফায়।
প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়ার পর লুলা জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মতো বিষয়কে সামনে রেখে প্রচার চালান। অন্যদিকে ফ্লাভিও তাঁর বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর সমর্থকগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে ডানপন্থি রাজনৈতিক শক্তিকে আরও সুসংহত করার চেষ্টা করেন। তবে দ্বিতীয় দফায় ভোটারদের সমর্থন নিজের দিকে টেনে নিয়ে শেষ পর্যন্ত জয় পান লুলা।
বিবিসি ও আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রাজিলের আধুনিক নির্বাচনী ইতিহাসে এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। প্রথম দফায় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েও দ্বিতীয় দফায় পরাজিত হওয়ার এমন নজির দেশটির গণতান্ত্রিক ইতিহাসে বিরল। ফলে লুলার এই জয়কে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাবেক প্রেসিডেন্টের ছেলেকে হারিয়ে লুলার জয়
ফ্লাভিও বলসোনারো ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে। তাঁর বাবা ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজিত হওয়ার পর জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে নির্বাচনের ফল উল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনায় তাঁর কারাদণ্ড হয়।
এবার বাবার পরিবর্তে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সিনেটর ফ্লাভিও। প্রথম দফায় এগিয়ে থাকার পরও রানঅফে পরাজিত হওয়ায় প্রেসিডেন্ট পদে ফেরার স্বপ্ন পূরণ হলো না বলসোনারো পরিবারের।
নির্বাচন নিয়ে আপত্তি, বাতিলের দাবি ফ্লাভিওর
নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানো নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। গণপরিবহনসংক্রান্ত সমস্যাসহ বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে ভোটারদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ফ্লাভিও বলসোনারো।
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফল ঘোষণার পর নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আপত্তি তুলে ভোট বাতিলের দাবি জানান তিনি। এ নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। ফলে নির্বাচনে জয়ী হলেও লুলার সামনে রাজনৈতিক বিরোধ ও আইনি বিতর্ক মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ থাকছে।
লুলার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার আগে লুলার সামনে অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয়, অপরাধ দমন এবং রাজনৈতিক বিভাজন মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাঁর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আগামী ৫ জানুয়ারি ২০২৭ তাঁর নতুন মেয়াদ শুরু হওয়ার কথা। এই জয়ের মধ্য দিয়ে লুলা শুধু নিজের রাজনৈতিক অবস্থানই শক্তিশালী করলেন না, বরং লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থি রাজনীতির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যেও বামপন্থি নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখলেন।
সূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা, বিবিসি ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।
















